ফুটবল জার্সির ইতিহাস ও বিবর্তন

ফুটবল জার্সি: বদলে যাওয়ার মহাকাব্য

ফুটবল মাঠে এগারো বনাম এগারো জনের লড়াইয়ে যে জিনিসটি সবার আগে চোখে পড়ে, তা হলো খেলোয়াড়দের গায়ের জার্সি। লাল, নীল, হলুদ কিংবা চেনা সাদা-কালো ডোরাকাটা; এই পোশাকগুলো এখন আর কেবল খেলার অনুষঙ্গ নয়; এগুলো একেকটি ক্লাবের ইতিহাস, জাতীয় পরিচয়ের প্রতীক, কোটি সমর্থকের আবেগ এবং বিলিয়ন ডলারের বৈশ্বিক ব্যবসার চলমান ভাষা।

কিন্তু আধুনিক ফুটবলের এই চোখধাঁধানো ফ্যাশনের শুরুটা মোটেও এত পরিপাটি ছিল না। আজকের অতি হালকা, ঘাম-শোষক, শরীরের সঙ্গে মানানসই সিন্থেটিক জার্সির পেছনে আছে প্রায় দেড় শ বছরের রোমাঞ্চকর বিবর্তন। ভারী উলের গার্নসি, ক্রিকেটের সাদা পোশাক, মাথার রঙিন টুপি, বুকের স্যাশ, পিঠের নম্বর, স্পন্সরের লোগো, রেপ্লিকা শার্ট, ড্রাই-ফিট প্রযুক্তি, সব মিলিয়ে ফুটবল জার্সির ইতিহাস যেন খেলার ভেতর দিয়ে লেখা এক ফ্যাশন-উপাখ্যান।

শুরুটা ছিল সাদামাটা

ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি ও শেষভাগে, যখন ইংল্যান্ডে ফুটবল ধীরে ধীরে সংগঠিত খেলায় রূপ নিচ্ছে, তখন খেলোয়াড়দের জন্য আলাদা কোনো নির্দিষ্ট ‘জার্সি’ ছিল না। কেউ মাঠে নামতেন সাধারণ কলারওয়ালা শার্ট পরে, কেউ ক্রিকেটের সাদা পোশাকে, আবার অনেক ক্লাবের খেলোয়াড়রা পরতেন উলের তৈরি গার্নসি বা ভারী জার্সি। অনেক ক্ষেত্রে একই দলের খেলোয়াড়দের আলাদা করে চেনার জন্য মাথায় রঙিন ক্যাপ, গলায় স্কার্ফ বা শরীরের ওপর স্যাশ ব্যবহার করা হতো।

১৮৮৮ সালে ইংলিশ ফুটবল লিগ গঠনের পর দলগুলোর আলাদা রং ও পোশাকের গুরুত্ব বাড়তে থাকে। অ্যাক্রিংটন লাল রঙ, বোল্টন ওয়ান্ডারার্স ও প্রেস্টন নর্থ-এন্ড সাদা রঙ, আর অনেক ক্লাব স্ট্রাইপ বা হাফ-অ্যান্ড-হাফ নকশার পোশাক বেছে নেয়। তবে সেই পোশাকগুলো ছিল আজকের জার্সির তুলনায় অনেক ভারী। সামান্য বৃষ্টি বা ঘামে ভিজলেই সেগুলো শরীরে আটকে যেত, ওজন বাড়ত, আর ৯০ মিনিট দৌড়ানো হয়ে উঠত এক নীরব যুদ্ধ। মাঠের সৌন্দর্যের চেয়ে তখন পোশাকের প্রধান কাজ ছিল নিজের দলকে চিনতে পারা।

ফুটবল জার্সির ইতিহাসে সবচেয়ে বিখ্যাত নম্বর ১০ । ছবি: এআই

পিঠের নম্বর: পরিচয়ের নতুন ভাষা

আজ ‘নম্বর ১০’ বললেই পেলে, ম্যারাডোনা, মেসি কিংবা অসংখ্য সৃজনশীল প্লে-মেকারের কথা মনে পড়ে। কিন্তু পিঠের নম্বর একসময় ফুটবলের স্বাভাবিক অংশ ছিল না। খেলোয়াড়দের আলাদা করে চেনাতে রেফারি, দর্শক ও সংবাদমাধ্যমের জন্য এক নতুন ব্যবস্থা দরকার ছিল।

১৯২৮ সালে আর্সেনাল ও চেলসি পরীক্ষামূলকভাবে নম্বরযুক্ত জার্সি পরে মাঠে নামে। তবে তারা একে অন্যের বিপক্ষে নয়, আলাদা দুটি ম্যাচে। এরপর ১৯৩৩ সালের এফএ কাপ ফাইনালে এভারটন ও ম্যানচেস্টার সিটির খেলোয়াড়রা ১ থেকে ২২ নম্বরযুক্ত জার্সি পরে ওয়েম্বলিতে নামেন। এভারটনের খেলোয়াড়দের দেওয়া হয় ১ থেকে ১১, আর ম্যানচেস্টার সিটির খেলোয়াড়দের ১২ থেকে ২২ নম্বর ।

এই পরিবর্তন ফুটবলকে শুধু শৃঙ্খলিত করেনি; এটি জার্সিকে ব্যক্তিগত পরিচয়ের বাহনেও পরিণত করেছে। আগে জার্সি ছিল দলের রং; এরপর নম্বর হলো খেলোয়াড়ের অবস্থান, ভূমিকা ও স্মৃতির চিহ্ন। ধীরে ধীরে নম্বরের সঙ্গে জুড়ে গেল কিংবদন্তি, বাজার, ভক্তির ভাষা এবং ব্যক্তিগত ব্র্যান্ডিং।

আসল জার্সির অনুপ্রেরণায় জার্সি তৈরি করে বিভিন্ন ফ্যাশন ব্র‌্যান্ডও । ছবি: লা রিভ

কটন থেকে সিন্থেটিক: প্রযুক্তির স্পর্শে বদলে যাওয়া

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ফুটবলের গতি বাড়তে থাকে। মাঠ বড়, খেলা দ্রুত, খেলোয়াড়দের দৌড় বেশি, ফলে ভারী উল বা মোটা কাপড় আর আধুনিক ফুটবলের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারছিল না। ১৯৫০ ও ১৯৬০-এর দশকে তুলনামূলক হালকা কটন ও রেয়ন জার্সি জনপ্রিয় হয়। কলার, ভি-নেক, গোল গলা মিলিয়ে নকশাতেও আসে বৈচিত্র্য।

তবে বড় পরিবর্তন আসে ১৯৭০ ও ১৯৮০-এর দশকে, যখন পলিয়েস্টার ও সিন্থেটিক ফাইবার ফুটবল জার্সির জগতে প্রবেশ করে। এসব কাপড় সহজে রং ধরে, দ্রুত শুকায়, তুলনামূলকভাবে হালকা, এবং ডিজাইনের ক্ষেত্রে নির্মাতাদের আরও স্বাধীনতা দেয়। সেই সময় থেকেই জার্সি কেবল মাঠের পোশাক নয়, দৃশ্যমান পরিচয় ও বাজারযোগ্য পণ্য হয়ে উঠতে থাকে।

আধুনিক জার্সিতে নাইকির ড্রা-ফিট, অ্যাডিডাসের এয়ারো-রেডি, বা সাম্প্রতিক এয়ারো-ফিট ধরনের প্রযুক্তি ঘামকে ত্বক থেকে কাপড়ের উপরিভাগে এনে দ্রুত বাষ্পীভবনে সাহায্য করে। লক্ষ্য একটাই, খেলোয়াড় যেন ভেজা, ভারী, শরীরে লেগে থাকা পোশাকের অস্বস্তি ভুলে মাঠে পুরো মনোযোগ দিতে পারেন। একসময় যে জার্সি খেলোয়াড়কে ভারী করত, আজ সেই জার্সিই খেলোয়াড়ের গতির সহযোগী।

মেসির জার্সিতে ইউনিসেফের লোগো তাঁর দীর্ঘদিনের সমাজকল্যাণমূলক কাজের প্রতীক । ছবি: সংগৃহীত

স্পন্সরশিপ: বুকের ওপর বিজ্ঞাপনের জন্ম

ফুটবল জার্সির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক মোড় আসে ১৯৭০-এর দশকে। ১৯৭৩ সালে জার্মান ক্লাব আইনট্রাখট ব্রাউনশভাইগ তাদের জার্সিতে জ্যাগারমাইস্টারের প্রতীক ব্যবহার করে আলোড়ন তোলে। শুরুতে ফুটবল কর্তৃপক্ষের আপত্তি ছিল; কিন্তু খুব দ্রুত বোঝা গেল, জার্সির বুক হলো বিশ্বের সবচেয়ে আবেগঘন বিজ্ঞাপনী জায়গাগুলোর একটি।

এরপর ইউরোপের বড় ক্লাবগুলো একে একে স্পন্সরশিপের পথে হাঁটে। ১৯৭৯ সালে লিভারপুলের হিটাচি চুক্তি ইংলিশ ফুটবলে জার্সি স্পন্সরশিপের নতুন অধ্যায় খুলে দেয়। আজ এমিরেটস, কাতার এয়ারওয়েজ, স্পটিফাই, স্ন্যাপড্রাগন কিংবা টিমভিউয়ারের মতো প্রতিষ্ঠান ক্লাবের জার্সিতে নিজেদের নাম দেখাতে বিশাল অঙ্কের অর্থ ব্যয় করে। জার্সি তাই একসঙ্গে আবেগ, ব্র্যান্ড, ডিজিটাল দৃশ্যমানতা এবং অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দু।

রেপ্লিকা জার্সি: গ্যালারি থেকে রাস্তায়

জার্সির আরেক বিপ্লব ঘটে যখন ক্লাবের পোশাক সমর্থকের আলমারিতে ঢুকে পড়ে। ১৯৭০-এর দশকে অ্যাডমিরাল ব্র্যান্ডের হাত ধরে রেপ্লিকা ফুটবল শার্টের বাজার বড় হতে শুরু করে। যে জার্সি আগে খেলোয়াড়ের একান্ত মাঠের পোশাক ছিল, সেটিই হয়ে ওঠে শিশু-কিশোর, পরে প্রাপ্তবয়স্ক সমর্থক, কালেক্টর এবং ফ্যাশনপ্রেমীদের প্রিয় জিনিস।

প্রিয় তারকার নাম ও নম্বর লেখা জার্সি পরে গ্যালারিতে বসা এখন ফুটবল সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। বার্সেলোনা, রিয়াল মাদ্রিদ, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, লিভারপুল, আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, প্রতিটি নামের সঙ্গে জার্সি এখন স্মৃতি, পরিচয় ও ফ্যাশনের সমন্বিত পণ্য। কোনো কোনো ভিন্টেজ জার্সি আবার সংগ্রাহকদের কাছে শিল্পবস্তুর মর্যাদাও পায়।

জার্সি যখন স্ট্রিটওয়্যার

ফুটবল জার্সি আজ আর শুধু স্টেডিয়ামের নয়। এটি এখন স্ট্রিটওয়্যার, ক্যাজুয়াল ফ্যাশন, মিউজিক ভিডিও, কনসার্ট, ক্যাফে, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস—সবখানেই দেখা যায়। জিন্স, কার্গো প্যান্ট, স্নিকার্স বা জ্যাকেটের সঙ্গে ভিন্টেজ ফুটবল জার্সি এখন তরুণ প্রজন্মের পরিচিত স্টাইল।

এই পরিবর্তনের পেছনে আছে নস্টালজিয়া, সেলিব্রিটি সংস্কৃতি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং ‘রেট্রো’ ফ্যাশনের পুনর্জাগরণ। নব্বইয়ের জার্সির ঢিলেঢালা কাট, উজ্জ্বল প্যাটার্ন, বড় কলার কিংবা সাহসী রং আবার ফিরে এসেছে। এমনকি অ্যানিমে, সংগীত, শিল্পকলা ও স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে মিলিয়ে বিশেষ সংস্করণের ফুটবল জার্সিও এখন ফ্যাশন বাজারে আলাদা জায়গা করে নিচ্ছে।

সম্প্রতি জুরিখের ফিফা মিউজিয়ামের সংগ্রহে বাংলাদেশের জাতীয় দলের জার্সি যুক্ত হয়েছে । ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের জার্সি: গোলাপি স্মৃতি থেকে জুরিখের গর্ব

বিশ্ব ফুটবলের এই জার্সি-উপাখ্যানে বাংলাদেশের গল্পও কম রঙিন নয়। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীনতার পক্ষে জনমত ও তহবিল গঠনের জন্য গঠিত হয়েছিল স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল। মজার বিষয়, সেই ঐতিহাসিক দলের জার্সি লাল-সবুজ নয়; গোলাপি ছিল বলে বাংলাদেশের ক্রীড়া-ইতিহাসে উল্লেখ পাওয়া যায়। স্বাধীনতার পর সত্তরের দশকেও বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের জার্সিতে সেই গোলাপি ধারার প্রভাব ছিল। পরে ধীরে ধীরে জাতীয় পতাকার লাল-সবুজ রং জাতীয় দলের ফুটবল জার্সির প্রধান পরিচয় হয়ে ওঠে।

বাংলাদেশের জার্সি নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে যুক্ত হয়েছে এক গর্বের খবর। ২০২৬ সালের জুনে প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, সুইজারল্যান্ডের জুরিখে ফিফা মিউজিয়ামের সংগ্রহে বাংলাদেশের জাতীয় দলের জার্সি যুক্ত হয়েছে। ডিজাইনার তাসমিত আফিয়াত আর্নির নকশায় তৈরি এই জার্সিতে শুধু রং নয়, বাংলাদেশের সংস্কৃতি, জামদানি অনুপ্রেরণা, সুন্দরবনের বাঘ, দোয়েল ও ইলিশের মতো পরিচয়ের উপাদানও তুলে ধরা হয়েছে। আরও সুন্দর বিষয় হলো, তিনি দেশের প্রতি ভালোবাসা থেকে এই কাজের জন্য কোনো পারিশ্রমিক নেননি বলে জানিয়েছেন। কারন এই ঘটনা শুধু একটি জার্সির আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি নয়; এটি বাংলাদেশের ফুটবল-পরিচয়কে বিশ্বমঞ্চে দৃশ্যমান করার এক সৃজনশীল মুহূর্ত।

প্রিয় দলের জার্সি পছন্দ করে শিশুরাও । ছবি: লা রিভ

বাংলাদেশে জার্সির মৌসুমি অর্থনীতি

বাংলাদেশে ফুটবল জার্সি কেনাকাটার আলাদা কোনো পূর্ণাঙ্গ সরকারি পরিসংখ্যান পাওয়া যায় না। তবে বিশ্বকাপ কিংবা বড় আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট এলেই এই বাজারের ব্যাপ্তি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ব্যবসায়ী ও বাজার-ভিত্তিক আনুমানিক হিসাব অনুযায়ী, ফুটবল ও ক্রিকেট বিশ্বকাপ ঘিরে দেশে স্পোর্টসওয়্যার ও স্পোর্টস মার্চেন্ডাইজের বাজার প্রায় ১,০০০ থেকে ১,২০০ কোটি টাকার হতে পারে। এই হিসাবের মধ্যে শুধু ফুটবল জার্সি নয়; জার্সি, কিট, পতাকা, স্পোর্টস অ্যাকসেসরিজ এবং সংশ্লিষ্ট পণ্যের বিক্রিও অন্তর্ভুক্ত।

বাংলাদেশে জার্সির বাজার সবচেয়ে বেশি প্রাণ পায় বিশ্বকাপ ফুটবলকে কেন্দ্র করে। ঢাকার গুলিস্তান, বঙ্গবাজার, নিউমার্কেট, মিরপুর, চট্টগ্রামের রিয়াজউদ্দিন বাজারসহ দেশের বড় শহরগুলোর পাইকারি ও খুচরা দোকানে তখন জার্সির চাহিদা কয়েক গুণ বেড়ে যায়। ২০২২ বিশ্বকাপের সময় গুলিস্তানকেন্দ্রিক বাজারে কয়েক শ খুচরা ও পাইকারি দোকান সক্রিয় ছিল বলে সেইসময়ের পত্রিকাগুলি উল্লেখ করেছিল। শুধু ঢাকাতেই প্রায় পাঁচ শতাধিক স্পোর্টস অ্যাকসেসরিজ দোকানে বিশ্বকাপ ঘিরে জার্সি ও সংশ্লিষ্ট পণ্য বিক্রির জোয়ার দেখা যায়।

বাংলাদেশে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের জার্সির চাহিদাই সবচেয়ে বেশি। ভক্তদের মধ্যে এই দুই দলের আবেগ এতটাই প্রবল যে বিশ্বকাপের সময় শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত নীল-সাদা আর হলুদ-সবুজ জার্সি ছড়িয়ে পড়ে। এর বাইরে জার্মানি, ফ্রান্স, পর্তুগাল, স্পেন এবং ক্লাব ফুটবলের জনপ্রিয় দলগুলোর জার্সিও তরুণদের মধ্যে ভালো বিক্রি হয়। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের জাতীয় দলের লাল-সবুজ জার্সির প্রতিও আগ্রহ বাড়ছে, বিশেষ করে নতুন ডিজাইন, অনলাইন প্রচার এবং ফিফা মিউজিয়ামে বাংলাদেশের জার্সি জায়গা পাওয়ার খবরের পর।

দামের দিক থেকেও জার্সির বাজারে রয়েছে বৈচিত্র্য। সাধারণ মানের জার্সি কয়েক শ টাকার মধ্যে পাওয়া যায়, আবার ভালো মানের কাপড়, উন্নত প্রিন্ট, নাম-নম্বরসহ কাস্টমাইজড জার্সির দাম এক হাজার টাকা বা তারও বেশি হতে পারে। শিশুদের জার্সি তুলনামূলক কম দামে বিক্রি হয়। ফুটপাত, মৌসুমি স্টল, ফেসবুক পেজ, অনলাইন শপ এবং বড় স্পোর্টসওয়্যার দোকান; সব জায়গাতেই এখন জার্সির আলাদা ক্রেতা আছে।

অনলাইন সার্চের আচরণেও এই পরিবর্তন বোঝা যায়। এখন ক্রেতারা শুধু ফুটবল জার্সি বা দলভিত্তিক জার্সি খোঁজেন না; কেউ লেখেন জার্সি ডিজাইন, কেউ ফুটবল জার্সি ডিজাইন, আবার কেউ ফুটবল খেলার জার্সি ডিজাইন বা নতুন জার্সি ডিজাইন ফুটবল লিখে নকশার ধারণা খোঁজেন। একই সঙ্গে জার্সি টি শার্ট ডিজাইন, ফুল হাতা জার্সি, কাস্টমাইজ জার্সি, আর্জেন্টিনা জার্সিব্রাজিলের জার্সি—এমন নির্দিষ্ট চাহিদাও অনলাইন বাজারে জার্সি কেনাকাটাকে আরও লক্ষ্যভিত্তিক করে তুলেছে।

বাংলাদেশ শুধু জার্সি কেনে না, জার্সি তৈরি ও রপ্তানিও করে। ২০২২ সালের এক পত্রিকার রিপোর্টে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের স্থানীয় নিটওয়্যার কারখানাগুলো ফিফা বিশ্বকাপ ও ইউরোপীয় ক্লাবের জন্য রেপ্লিকা শার্ট ও প্র্যাকটিস কিট সরবরাহ করছে ফুটবলের মৌসুম এলেই। যেমন, চট্টগ্রামভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠান কাতার বিশ্বকাপ ২০২২-এর জন্য ৬ লাখ শার্ট পাঠিয়েছিল। জার্সির রেপ্লিকা তৈরির জন্য এখনো পর্যন্ত বাংলাদেশ আস্থার তালিকাতেই রয়েছে।

একটি পোশাক, অনেক পরিচয়

ভারী উলের গার্নসি থেকে ড্রাই-ফিট, মাথার ক্যাপ থেকে পিঠের নম্বর, গোলাপি স্মৃতি থেকে বাংলাদেশের লাল-সবুজ—ফুটবল জার্সির ইতিহাস আসলে মানুষের উদ্ভাবন, আবেগ, বাণিজ্য ও সংস্কৃতির সম্মিলিত গল্প। একসময় জার্সির কাজ ছিল শুধু মাঠে নিজের দলকে চেনানো। আজ সেই জার্সি বলে দেয় আপনি কোন ক্লাব ভালোবাসেন, কোন দেশের পাশে দাঁড়ান, কোন সময়ের ফুটবল আপনাকে নাড়া দেয়, কোন তারকার স্মৃতি আপনার হৃদয়ে সবচেয়ে উজ্জ্বল। তাই ফুটবল জার্সি আর সাধারণ কাপড় নয়; এটি মাঠের ভাষা, গ্যালারির স্লোগান, রাস্তার ফ্যাশন এবং কোটি মানুষের মেলবন্ধনের সবচেয়ে রঙিন প্রতীক।

  • লেখা: খাদিজা ফাল্গুনী

  • No products in the cart.
Filters
Download
Our App