অতিরিক্ত গরমে কি কি সমস্যা হয়- গরমে খাওয়া দাওয়া এবং গরম থেকে বাঁচার উপায়

অতিরিক্ত গরমের সমস্যা, খাওয়া-দাওয়া এবং গরম থেকে বাঁচার উপায়

অতিরিক্ত গরমে কি কি সমস্যা হয়- গরমে খাওয়া দাওয়া এবং গরম থেকে বাঁচার উপায়

সোস্যাল মিডিয়ায় খেয়াল করলে দেখবেন, সম্প্রতি ’সামার লাভার’ কথাটা রীতিমতো উপহাসে রূপ নিয়েছে। কারণ আর কিছুই নয়, গত কয়েক বছরের অস্বাভাবিক গরম। রোদে উত্তপ্ত ফ্রাইংপ্যানে ডিম পোচের ভিডিও বাংলাদেশের বাস্তবতা হয়ে উঠতে সম্ভবত আর বেশিদিন নেই। এমন শঙ্কার যথোপযুক্ত কারন আছে বৈকি। অতিরিক্ত গরম অনেক সময় স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণও হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে এপ্রিল থেকে জুন; এই সময়ে তাপমাত্রা, আর্দ্রতা, ধুলা, যানজট, লোডশেডিং, বাইরে কাজের চাপ এবং স্কুল-অফিসের যাতায়াত মিলিয়ে শরীর দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়ে। তাই অতিরিক্ত গরমে করণীয় কাজ শুধু পানি খাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; খাবার, ঘরের পরিবেশ, বাইরে চলাফেরা, শিশু ও বয়স্কদের যত্ন এবং পোশাক সবকিছু নিয়েই সচেতন হতে হয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও স্বাস্থ্যবিষয়ক সংস্থাগুলোর পরামর্শে গরমে শরীর ঠান্ডা রাখা, পর্যাপ্ত পানি পান করা, সরাসরি রোদ এড়িয়ে চলা এবং হিটস্ট্রোকের লক্ষণ দ্রুত চেনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় জনস্বাস্থ্য সংস্থা CDC (The Centers For Disease Control And Prevention)  এর তথ্য অনুযায়ী অতিরিক্ত গরমে মাথা ঘোরা, দুর্বলতা, বমিভাব, মাথাব্যথা, পেশিতে টান, অতিরিক্ত ঘাম বা শ্বাসকষ্টের মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে। বাংলাদেশেও Directorate General of Health Service (DGHS) ও UNICEF শিশু, গর্ভবতী নারী, বয়স্ক ও দীর্ঘসময় বাইরে থাকা মানুষদের জন্য বিশেষ সতর্কতার কথা জানিয়েছে

অতিরিক্ত গরমে যেসব সমস্যা হয়

তীব্র গরমে শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে যায়। ঘামের মাধ্যমে শরীর ঠান্ডা হতে চায়, কিন্তু অতিরিক্ত ঘামের সঙ্গে পানি ও লবণ বেরিয়ে গেলে ডিহাইড্রেশন হতে পারে। এর ফলে দুর্বলতা, মাথা ঘোরা, প্রস্রাব কমে যাওয়া, মুখ শুকিয়ে যাওয়া, ক্লান্তি ও মনোযোগ কমে যেতে পারে।

আরও গুরুতর অবস্থায় তাপদাহ জনিত ক্লান্তি বা হিটস্ট্রোক হতে পারে। CDC তাপদাহ সম্পর্কিত অসুস্থতার মধ্যে হিট স্ট্রোক, অতিরিক্ত ক্লান্তি,মাথা ঘোরা, অজ্ঞান হয়ে পড়া ও র‌্যাশের কথা উল্লেখ করেছে। হিটস্ট্রোক জরুরি চিকিৎসার বিষয়। গরমে বিভ্রান্তি, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, শরীর খুব গরম হয়ে যাওয়া বা আচরণে অস্বাভাবিকতা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেয়ার পরামর্শ দেয়া হয়েছে।

শিশুদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও বেশি। তারা অনেক সময় তৃষ্ণা লাগলেও বলতে পারে না, খেলতে গিয়ে রোদে বেশি সময় থাকে এবং দ্রুত পানিশূন্য হয়ে যেতে পারে। UNICEF বাংলাদেশে শিশুদের গরমে ঠান্ডা জায়গায় রাখা, দুপুর-পরবর্তী গরম সময়ে বাইরে না রাখা, হালকা, ব্রিদেবল পোশাক পরানো এবং পর্যাপ্ত পানি খাওয়ানোর পরামর্শ দিয়েছে।

অতিরিক্ত গরমে কী খাওয়া উচিত

গরমে খাবারের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত শরীরকে হালকা রাখা এবং পানির ঘাটতি কমানো। সারাদিনে নিয়ম করে পানি পান করতে হবে, শুধু তৃষ্ণা লাগার অপেক্ষায় থাকলে চলবে না। যারা বাইরে কাজ করেন, রিকশা/বাসে যাতায়াত করেন বা বেশি ঘামেন, তাঁদের জন্য পানি, ওরস্যালাইন, ডাবের পানি, লেবুপানি বা ঘরে তৈরি কম চিনি দেওয়া শরবত উপকারী হতে পারে। DGHS তীব্র গরমে নিরাপদ পানি পান ও রাস্তার অনিরাপদ খাবার-পানীয় এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছে।

খাবারে রাখতে পারেন ভাতের সঙ্গে পাতলা ডাল, সবজি, মাছ, টক দই, শসা, লাউ, ঝিঙে, পটল, করলা, তরমুজ, পেঁপে, কলা বা মৌসুমি ফল। অতিরিক্ত তেল-মসলাযুক্ত, খুব ঝাল, ভারী ভাজাপোড়া এবং বেশি চিনি দেওয়া ঠান্ডা পানীয় শরীরকে আরও ক্লান্ত করতে পারে। গরমে অনেকেই একবারে বেশি খাবার খেয়ে অস্বস্তি পান; সে ক্ষেত্রে অল্প অল্প করে খাওয়া ভালো।

শিশুদের জন্য খাবার যেন সহজপাচ্য হয়। স্কুলে গেলে পানির বোতল, হালকা টিফিন, ফল বা ঘরে তৈরি খাবার দেওয়া ভালো। বাইরে খোলা শরবত, কাটা ফল বা শীতল কার্বনেটেড পানীয় ও আইসক্রিম এড়িয়ে চলা উচিত।

গরম থেকে বাঁচার উপায়: দৈনন্দিন লাইফস্টাইল

দুপুর ১২টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত রোদ সাধারণত বেশি তীব্র থাকে। খুব প্রয়োজন না হলে এই সময়ে বাইরে যাওয়ার পরিকল্পনা কমানো ভালো। অফিস, বাজার বা স্কুলের কাজ থাকলে সকাল বা বিকেলের সময় বেছে নেওয়া যেতে পারে। বাইরে গেলে ছাতা, ক্যাপ, সানগ্লাস ও পানির বোতল রাখুন।

ঘরে জানালায় পর্দা ব্যবহার, দিনের বেলা সরাসরি রোদ ঢোকা কমানো, ফ্যানের বাতাস চলাচল ঠিক রাখা, রান্নাঘরের তাপ কমাতে সময়মতো রান্না সেরে ফেলা, এসব ছোট অভ্যাসও কাজে দেয়। লোডশেডিং হলে শিশু, বয়স্ক বা অসুস্থ মানুষদের তুলনামূলক ঠান্ডা ঘরে রাখা জরুরি।

যারা বাইরে কাজ করেন যেমন ডেলিভারি কর্মী, নির্মাণশ্রমিক, ট্রাফিক পুলিশ, দোকানকর্মী বা মাঠে কাজ করা মানুষ, তাঁদের নিয়মিত বিরতি, ছায়ায় বিশ্রাম এবং পানির ব্যবস্থা থাকা দরকার। দীর্ঘসময় রোদে থাকার পর মাথা ঘোরা, বমিভাব বা অস্বাভাবিক দুর্বলতা দেখা দিলে কাজ থামিয়ে ঠান্ডা জায়গায় যেতে হবে।

গরমে ফ্যাশন: কী পরলে আরাম পাবেন

গরমে পোশাক শুধু স্টাইলের বিষয় নয়; এটি শরীরের স্বস্তির সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত। হালকা, ঢিলেঢালা, ব্রিদেবল ফেব্রিক বেছে নেওয়া সবচেয়ে ভালো। সুতি, ভিসকোস, লিনেন-ব্লেন্ড, কটন-ব্লেন্ডেড জর্জেট, হালকা ফেইলি কাপড় গরমে তুলনামূলক আরামদায়ক লাগে।

নারীদের জন্য সুতির কামিজ, কুর্তি, ঢিলেঢালা টিউনিক, পালাজ্জো, সালোয়ার বা হালকা ওড়না বাছাই করা আবশ্যক। পুরুষদের জন্য কটন শার্ট পাঞ্জাবি, পোলো টি-শার্টের সাথে রিল্যাক্সড ফিট ট্রাউজার বা চিনোস প্যান্ট ভালো পছন্দ হতে পারে। শিশুদের জন্য নরম, ঘাম শোষে এমন কাপড়, ঢিলেঢালা কাট এবং সহজে ধোয়া যায় এমন পোশাক বেছে নেওয়া উচিত।

রঙের ক্ষেত্রেও সচেতন হওয়া যায়। সাদা, অফ-হোয়াইট, হালকা নীল, মিন্ট, বেইজ, লাইট গ্রে বা প্যাস্টেল রঙ গরমে চোখে আরাম দেয়। ভারী লেয়ার, টাইট ফিট, মোটা সিনথেটিক কাপড়, পোশাকে অতিরিক্ত কাজ ও লেয়ার গরমে অস্বস্তি বাড়াতে পারে।

কখন দ্রুত চিকিৎসা নেবেন

গরমে কেউ অজ্ঞান হয়ে গেলে, বিভ্রান্ত আচরণ করলে, শরীর অস্বাভাবিক গরম হলে, বারবার বমি হলে, শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে বা এক ঘণ্টার বেশি দুর্বলতা ও মাথা ঘোরা থাকলে দেরি না করে চিকিৎসা নিতে হবে। CDC এসব ক্ষেত্রে ঠান্ডা জায়গায় নেওয়া, কাপড় ঢিলা করা, ঠান্ডা ভেজা কাপড় ব্যবহার করা এবং অল্প অল্প করে পানি পান করানোর পরামর্শ দিয়েছে। তবে লক্ষণ বাড়লে দ্রুত চিকিৎসা জরুরি।

অতিরিক্ত গরমে করণীয় হলো, নিজের শরীরের সংকেত বোঝা, পর্যাপ্ত পানি পান করা, নিরাপদ খাবার খাওয়া, দুপুরের রোদ এড়িয়ে চলা এবং আরামদায়ক পোশাক বেছে নেওয়া। বাংলাদেশের গরমে সুস্থ থাকতে বড় পরিবর্তনের চেয়ে নিয়মিত ছোট অভ্যাস বেশি কার্যকর। পরিবারে শিশু, বয়স্ক, গর্ভবতী নারী ও অসুস্থ মানুষ থাকলে তাঁদের দিকে আলাদা নজর রাখা জরুরি। গরমকে হালকাভাবে না নিয়ে সচেতনভাবে চললেই দৈনন্দিন জীবন অনেক বেশি নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক হতে পারে।

লেখা: খাদিজা ফাল্গুনী

ছবি: লা রিভ ও এআই

  • No products in the cart.
Filters
30% offer Hurry, Limited Time Offer! T&C
Download
Our App