জ্যাকেট নাকি ওভারকোট?

জ্যাকেট নাকি ওভারকোট?

জ্যাকেট নাকি ওভারকোট?

শীত এলেই ফ্যাশন দুনিয়ায় যে পোশাক দুটি সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসে, তা হলো জ্যাকেট ওভারকোট। এগুলো শুধু শীত থেকে রক্ষা করার জন্য নয়, বরং ব্যক্তিত্ব, রুচি ও স্টাইল প্রকাশের ভাষা হয়ে উঠেছে। নারী এবং পুরুষ, সবার শীতের ক্লজেটে এখন জ্যাকেট মাস্ট। লেয়ারিং বলুন কিংবা সাদামাটা পোশাকে স্টেটমেন্ট লুক, জ্যাকেট ও ওভারকোটের নাম আসে প্রথমেই। কিন্তু জ্যাকেট ও ওভারকোটের পার্থক্য কী? কোন অকেশনে মানায়? স্টাইলিংই বা করবেন কীভাবে? সবকিছুর উত্তর থাকছে এই ব্লগে।

ক্লাসিক হাউন্ডসটুথ সোয়েটার। ছবি: লা রিভ

জ্যাকেট কী? ওভারকোট কী?

সাধারণত হালকা বা মাঝারি ভারী কাপড়ের তৈরি শার্টস্টাইলের শীতপোশাকই মূলত জ্যাকেট। । এটি কোমর বা নিতম্ব পর্যন্ত লম্বা হয় এবং সামনে চেইন, বোতাম বা স্ন্যাপ দিয়ে বন্ধ হয়। জ্যাকেট সাধারণত ক্যাজুয়াল, সেমি-ফর্মাল কিংবা অ্যাডভেঞ্চার-স্টাইল পোশাক হিসেবে জনপ্রিয়। এর মূল বৈশিষ্ট্য মুভমেন্টের ফ্রিডম, অর্থাৎ শরীরের গতিবিধিতে বাঁধা সৃষ্টি না করে তাপ ধরে রাখতে পারে।

ওভারকোট হলো হাঁটু পর্যন্ত বা তারও নিচে লম্বা, ভারী কাপড়ের শীতের পোশাক, সাধারণত উল, টুইড, কাশ্মির বা গ্যাবার্ডিন ফ্যাব্রিকের তৈরি। এটি ফর্মাল পোশাকের উপর পরা হয়, বিশেষ করে অফিস, মিটিং, বা বিশেষ অনুষ্ঠানে।

ওভারকোটের প্রধান কাজ হলো ঠান্ডা বাতাস থেকে সম্পূর্ণ শরীরকে সুরক্ষা দেওয়া এবং ইনার লেয়ারকে কভার করা। আজকাল ওভারকোট শুধুই উষ্ণতার উপকরন নয়, বরং ফ্যাশন নিরিক্ষণেরও উপকরণ হয়ে উঠেছে।

জ্যাকেট

জ্যাকেটের ইতিহাস প্রায় ১৯শ শতাব্দীর শেষের দিকে ইউরোপে। প্রথমে এটি ছিল শ্রমিক ও সৈনিকদের পোশাক। পরে ১৯৪০–৫০ দশকে আমেরিকান কলেজ কালচারে বোম্বার জ্যাকেট, লেদার জ্যাকেট, ডেনিম জ্যাকেট ফ্যাশনের অংশ হয়ে ওঠে। হলিউডে মার্লন ব্র্যান্ডো ও জেমস ডিনের পরনে লেদার জ্যাকেট দেখা গিয়েছিল, তারপর থেকেই এটি রিবেল ইয়ুথ কালচার–এর প্রতীক হয়ে উঠেছে।

নারীদের ফ্যাশনে জ্যাকেট প্রবেশ করে ১৯৬০-এর দশকে, যখন কোকো শ্যানেল তৈরি করেন ক্লাসিক শ্যানেল টুইড জ্যাকেট। জ্যাকেট আজও পাওয়ার, এলিগেন্স ও সিম্প্লিসিটির প্রতীক হয়ে রয়েছে।

নিজের ডিজাইন করা ক্লাসিক জ্যাকেটে কোকো শ্যানেল

ওভারকোট

ওভারকোটের ইতিহাস আরো পুরনো। ১৭শ শতকের ইউরোপে রাজপরিবার ও অভিজাতদের পরিধান হিসেবে জনপ্রিয় ছিল ওভারকোট। তখন এটি রয়্যালটি ও সফিস্টিকেশন এর চিহ্ন ছিল। ১৯শ শতকে যখন স্যুট ও ফর্মাল পোশাকের প্রচলন বাড়ে, ওভারকোট হয়ে ওঠে ‘জেন্টলম্যান’ দের আবশ্যিক পোশাক। পরবর্তীতে নারীদের জন্যও ট্রেঞ্চ কোট ও লং ওভারকোট চালু হয়। বিশেষ করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ের পর, যখন কর্মজীবী নারীরা পোশাকে ফ্যাশন ও ফাংশনের সমন্বয় মেলাতে শুরু করেন।

পুরুষদের স্টাইলিশ ওভারকোট। ছবি: লা রিভ

জ্যাকেটের প্রকারভেদ ফিচার

জ্যাকেটের ধরন অনেক—তাপমাত্রা, পরিবেশ, ও ব্যক্তিগত রুচি অনুযায়ী পরিবর্তিত হয়। জ্যাকেটে সাধারণত থাকে জিপার বা বোতাম ক্লোজার, পকেট, লাইনিং, এবং মাঝে মাঝে ওয়াটারপ্রুফ কোটিং। কিছু জ্যাকেটে ইনসুলেশন বা হিট রিটেনশন লেয়ারও থাকে। তবুও, প্রয়োজন, আয়োজন এবং ডিজাইনের ধরণ হিসেবে জ্যাকেটের রকমফের তৈরি হয়েছে অনেক।

  • ডেনিম জ্যাকেট একধরনের “অল-সিজন আইকন” বলা যায়। নীল জিন্স কাপড়ের তৈরি এই পোশাকটি মূলত ক্যাজুয়াল লুকের জন্য আদর্শ। ১৯৭০-এর দশকে আমেরিকান পপ কালচার এই জ্যাকেটকে নতুন মর্যাদা দেয়, আজও এটি ইয়ুথ ফ্যাশনের জনপ্রিয় নাম। গ্রীষ্মের শেষ দিক থেকে শীতের শুরু পর্যন্ত ডেনিম জ্যাকেট পরা যায়, কারণ এটি হালকা, বাতাস চলাচলযোগ্য এবং সহজে ধোয়া যায়। বিভিন্ন ওয়াশ ও রঙে পাওয়া যায় ডেনিমের জ্যাকেট, লাইট ব্লু, মিড ব্লু, ব্ল্যাক ইত্যাদি, যা স্কার্ট, ড্রেস কিংবা ট্রাউজারের সাথে সমান মানানসই।
  • বোম্বার জ্যাকেটের জন্ম মূলত সামরিক ইতিহাসে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়, মূলত পাইলটদের জন্য বোম্বার জ্যাকেট তৈরি করা হয়েছিল যাতে ঠান্ডা উচ্চতাতেও উষ্ণতা বজায় থাকে। আজ তা ফ্যাশন দুনিয়ায় এক স্টাইল স্টেটমেন্টে পরিণত হয়েছে। বোম্বার জ্যাকেটের কোমর ও হাতার প্রান্তে সাধারণত ইলাস্টিক কাফ এবং জিপার ফ্রন্ট ডিজাইন থাকে, যা একটি স্পোর্টি ও স্ট্রিমলাইন লুক দেয়। সাটিন, নাইলন, বা কটন ব্লেন্ড ফ্যাব্রিকের বোম্বার জ্যাকেট এখন পুরুষ ও নারীদের উভয়ের পোশাকে ফ্যাশনেবল বিকল্প।
  • পাফার বা ডাউন জ্যাকেট হলো হিমেল শীতের রক্ষাকবচ। ক্লাসিক পাফার বা ডাউন জ্যাকেট সাধারণত সিনথেটিক ফাইবার বা হাঁসের পালক (ডাউন) দিয়ে ভরা হয়, যার ফলে এটি হালকা হলেও অত্যন্ত উষ্ণ। ঠান্ডা হাওয়ায় এই জ্যাকেট বাতাস ঢুকতে দেয় না এবং শরীরের তাপ ধরে রাখে। আধুনিক ডিজাইনে এই জ্যাকেটগুলো এখন ভলিউম কমিয়ে স্মার্ট সিলুয়েট আকারে তৈরি হয়, যাতে পরিধানকারী ভারী দেখায় না। ভ্রমণপ্রেমী ও আউটডোর অ্যাকটিভিটি প্রিয়দের কাছে এটি এক নম্বর পছন্দ।
এই বছরের বাইকার জ্যাকেট ট্রেন্ড । ছবি: লা রিভ
  • লেদার জ্যাকেট হলো ফ্যাশন ইতিহাসের ’এভারগ্রিন পিস’, যা শক্তি, স্বাধীনতা আর আত্মবিশ্বাস প্রতিফলিত করে। প্রকৃত চামড়া বা সিনথেটিক লেদার দিয়ে তৈরি এই জ্যাকেটগুলো মোটরসাইকেল রাইডারদের কাছে বিশেষভাবে জনপ্রিয়, কারণ এগুলো বাতাস ও ধুলোবালি থেকে সুরক্ষা দেয়। আজকাল বাতাস-প্রতিরোধী অ্যাক্রিলিক ফেব্রিকেও স্টাইলিশ বাইকার জ্যাকেট ডিজাইন করা হচ্ছে। বাইকার জ্যাকেটের বিশেষত্ব হলো এর ওয়াটার-রেজিস্ট্যান্ট প্রকৃতি এবং দীর্ঘস্থায়ীত্ব; ঠিকভাবে যত্ন নিলে বছরের পর বছর টিকে থাকে। কালো, বাদামী বা ট্যান রঙের লেদার জ্যাকেটের সাথে জিন্স আর বুট – এই কম্বিনেশন এখনো ক্লাসিক।
  • পার্কা জ্যাকেট মূলত তুষারাচ্ছন্ন অঞ্চলের জন্য তৈরি হলেও এখন শহুরে ফ্যাশনের অংশ। এটি সাধারণত লম্বা ডিজাইনের হয়, এবং এর হুডে থাকে ফার বা ফক্স-ফার ট্রিম। ওয়াটারপ্রুফ বা উইন্ডপ্রুফ ফ্যাব্রিক ব্যবহৃত হয় যাতে তীব্র ঠান্ডা ও বৃষ্টি দুইয়ের বিরুদ্ধেই সুরক্ষা পাওয়া যায়। পার্কা জ্যাকেটের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো এর আরাম ও ফাংশনালিটি। ক্লাসিক পার্কা জ্যাকেটের ভিতরে ইনসুলেটেড লেয়ার ও বাইরের দিক স্মার্ট ডিজাইন থাকে, যা রাস্তাঘাট থেকে ক্যাফে পর্যন্ত সব জায়গায় মানিয়ে যায়।
  • সবশেষে, ব্লেজার-স্টাইল জ্যাকেট হলো সেমি-ফর্মাল ও প্রফেশনাল ফ্যাশনের অন্যতম প্রতিনিধিত্বকারী পোশাক। এটি অফিস, কনফারেন্স বা বিজনেস মিটিংয়ের জন্য উপযুক্ত, কারণ এটি একদিকে উষ্ণ রাখে, অন্যদিকে কর্তৃত্বপূর্ণ ও পরিশীলিত লুক দেয়। উল, পলিয়েস্টার বা লিনেন-ব্লেন্ড ফ্যাব্রিকের ব্লেজারগুলো এখন বিভিন্ন কাটে আসে, সিঙ্গল বা ডাবল-ব্রেস্টেড, স্ট্রাকচার্ড শোল্ডার, এবং মিনিমাল ডিজাইনে। নারীদের জন্য ক্রপড ব্লেজার ও বেল্টেড ভ্যারিয়েশনও এখন জনপ্রিয়।
দেশেই পাওয়া যাচ্ছে ট্রেন্ডি ওভারকোট। ছবি: লা রিভ

ওভারকোটের প্রকারভেদ ফিচার

ওভারকোটের ডিজাইনগুলো তুলনামূলক ক্লাসিক, তবে প্রতিটি ধরনেই ভার্সেটাইল এলিমেন্ট লুকানো থাকে। ওভারকোটের ডিজাইন সাধারণত ডাবল লেয়ার, ইনার লাইনিং, বাটন ফ্রন্ট, এবং কখনো বেল্টসহ হয়ে থাকে। কিছু ওভারকোটে হাই কলার বা ল্যাপেল ডিজাইনও দেখা যায়। ওভারকোটের ফিচারের অদল-বদলে নামও বদলে যায়। তবে, জ্যাকেট এবং ওভারকোটের মূল পার্থক্য লম্বায়, তা অনায়াসে বলা যায়।

  • ওভারকোটের একটি জনপ্রিয় ধরণ ট্রেঞ্চ কোট। এ এক অনন্য ক্লাসিক ডিজাইন, যার জন্ম হয়েছিল যুদ্ধক্ষেত্রে, আর আজ তা ফ্যাশন দুনিয়ার র‍্যাম্পে রাজত্ব করছে। মূলত প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ সেনারা বৃষ্টির মধ্যে পরার জন্য এই লম্বা, বেল্টযুক্ত কোটটি ব্যবহার করত। ওয়াটারপ্রুফ গ্যাবার্ডিন কাপড়ে তৈরি ট্রেঞ্চ কোটগুলো সৈন্যদের রেইনপ্রুফ শিল্ডের মতো কাজ করত। এখন সেই একই পোশাক হয়ে উঠেছে এলিগ্যান্স ও পরিশীলিততার প্রতীক। হাঁটু বা মিড-লেংথ পর্যন্ত লম্বা এই কোটে সাধারণত এপুলেট, বেল্ট, ডাবল-ব্রেস্টেড বোতাম এবং বড় কলার থাকে। রঙের দিক থেকে বেইজ, ক্যামেল, নেভি ও ব্ল্যাক সবচেয়ে জনপ্রিয়। ট্রেঞ্চ কোট পরলে এক ধরনের স্ট্রাকচার্ড অথচ হালকা লুক পাওয়া যায়, যা পুরুষ ও নারী উভয়ের ফর্মাল ও ক্যাজুয়াল উভয় পোশাকের সঙ্গেই মানিয়ে যায়।
  • পিকোটের ইতিহাসও সামরিক জগত থেকে এসেছে। উনিশ শতকে ইউরোপীয় নেভি অফিসারদের ইউনিফর্ম হিসেবে ব্যবহৃত এই কোটটি ডাবল-ব্রেস্টেড ডিজাইনের, যা বুকে উষ্ণতা ধরে রাখতে সাহায্য করে। পুরু উলের ফেব্রিক, প্রশস্ত কলার ও বড় বোতাম এর বিশেষত্ব। সাধারণত নেভি ব্লু বা কালো রঙে পাওয়া যায় এবং হিপ-লেংথ হওয়ায় এটি তুলনামূলক হালকা। পিকোট একদিকে রাগড, অন্যদিকে ক্লাসিক, যে কারণে এটি আজও শহুরে পুরুষদের শীতকালীন ওয়ারড্রোবের অপরিহার্য অংশ। নারীদের সংস্করণেও এখন পিকোটে ফেমিনিন কাট ও স্লিম সিলুয়েট যুক্ত করা হচ্ছে।
চেস্টারফিল্ড কোটে জেমস বন্ড খ্যাত অভিনেতা ড্যানিয়েল ক্রেইগ। ছবি: সিনক্লেয়ার
  • চেস্টারফিল্ড কোটকে বলা হয় আধুনিক অফিসিয়াল আউটারওয়্যারের আদি সংস্করণ। এটি ১৯শ শতকের ইংল্যান্ডে উদ্ভূত, বিশেষত লর্ড চেস্টারফিল্ডের নামে নামকরণ। এই কোটের বৈশিষ্ট্য হলো এর স্মুথ, স্ট্রেইট কাট ও নির্ভুল ফিটিং। সাধারণত এটি উল বা উল-ব্লেন্ড ফেব্রিক দিয়ে তৈরি হয়, যা দেখতে নরম কিন্তু বেশ উষ্ণ। কলার সাধারণত ভেলভেট বা কনট্রাস্ট ম্যাটেরিয়ালে তৈরি হয়, যা এটিকে বাড়তি শৌখিনতা দেয়। পরিশালীত ডিজাইনের জন্য চেস্টারফিল্ড কোট আজও ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ ও প্রফেশনালদের পছন্দ।
  • ক্যাশমির কোট হলো বিলাসিতার প্রতীক। এই কোট তৈরি হয় ক্যাশমির ছাগলের নরম উল থেকে, যা পৃথিবীর অন্যতম সূক্ষ্ম ও উষ্ণ ফাইবার। এর টেক্সচার এমন মসৃণ যে পরিধানকারীর শরীরের সঙ্গে মিশে যায়। ক্যাশমির কোট সাধারণত এক্সক্লুসিভ সেগমেন্টে পড়ে। মূল্য তুলনামূলক বেশি, কিন্তু এর আরাম, সৌন্দর্য ও স্থায়িত্ব একে অনন্য করে তোলে। সাধারণত নিউট্রাল রঙে পাওয়া যায় যেমন ক্যামেল, ব্ল্যাক বা ক্রিম। এটি এমন এক পোশাক যা সময়ের পরীক্ষায়ও টিকে যায়, এবং স্টাইল, রুচি ও মর্যাদার নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত হয়।
  • উল ব্লেন্ড কোট আধুনিক নগরজীবনের জন্য তৈরি। এটি তুলনামূলক হালকা, মসৃণ ও আরামদায়ক। উল এবং সিনথেটিক ফাইবারের মিশ্রণে তৈরি এই কোটগুলো ঠান্ডা আবহাওয়ায় যথেষ্ট উষ্ণতা দেয়, কিন্তু ওজন কম হওয়ায় সারাদিন পরা যায়। অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী কিংবা ট্রাভেলার, সবাইয়ের জন্য উপযুক্ত এই কোট। ডিজাইনে এটি সাধারণত মিনিমাল, তবে বিভিন্ন কালার ও টেক্সচারে পাওয়া যায় তবে গ্রে, বেইজ, বা চারকোল শেডে বিশেষ জনপ্রিয়।
ওপেন ফ্রন্ট জ্যাকেট। ছবি: লা রিভ

আবহাওয়া অকেশন অনুযায়ী কোনটা  উপযোগি?

আবহাওয়া ও পরিবেশ অনুযায়ী জ্যাকেট বা ওভারকোট বেছে নেওয়াই স্মার্ট ফ্যাশনের মূল চাবিকাঠি। লাইট উইন্টার বা লেট ফলের সময় ডেনিম বা লাইট বোম্বার জ্যাকেট সবচেয়ে আরামদায়ক, কারণ এগুলো শরীরকে হালকা উষ্ণ রাখে কিন্তু অতিরিক্ত ভারী মনে হয় না। শীত যখন তীব্র হয়, তখন পাফার জ্যাকেট বা পার্কা সবচেয়ে কার্যকর, কারণ এগুলোর ইনসুলেশন ঠান্ডা বাতাসকে শরীরে ঢুকতে দেয় না। অফিস, মিটিং বা যেকোনো ফর্মাল ইভেন্টে ওভারকোট বা চেস্টারফিল্ড কোট পরলে লুক হয় পরিপাটি ও প্রফেশনাল। অন্যদিকে ক্যাজুয়াল আউটিং, ট্রাভেল বা উইকএন্ড ঘোরাঘুরির জন্য লেদার, ডেনিম বা বোম্বার জ্যাকেটই সবচেয়ে উপযুক্ত, কারণ এগুলো স্টাইল ও ফাংশন দুটোই দেয়। বৃষ্টিময় বা ঝড়ো দিনে ট্রেঞ্চ কোট কিংবা ওয়াটারপ্রুফ পার্কা দারুণ সুরক্ষা দেয়, পাশাপাশি এলিগ্যান্ট লুকও ধরে রাখে। বাংলাদেশের জলবায়ুতে ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত জ্যাকেট সবচেয়ে ব্যবহারিক পোশাক, তবে দেশের উত্তরাঞ্চলে ঠান্ডা বেশি থাকায় সেখানে ওভারকোটও বেশ মানানসই ও প্রয়োজনীয়।

জ্যাকেটের কলার ও কাটে এসেছে পরিবর্তন। ছবি: লা রিভ

স্টাইল গাইড

শীতের ফ্যাশনে পোশাকের কাট বা রঙ যেমন গুরুত্বপূর্ণ, ঠিক তেমনি গুরুত্বপূর্ণ হলো সেটি কীভাবে পরা হচ্ছে, অর্থাৎ স্টাইল। শুধু দামি জ্যাকেট বা ওভারকোট নয়, তার সঙ্গে মানানসই পোশাক, অ্যাক্সেসরিজ আর ফিটিংই নির্ধারণ করে একজনের সামগ্রিক লুক। প্র্যাকটিক্যালিটির সঙ্গে স্টাইলের নিখুঁত সংমিশ্রণেই নারী ও পুরুষদের জ্যাকেট ওভারকোট লুক আরও স্মার্ট, ব্যালান্সড ও ট্রেন্ডি করে তুলতে পারে

ছেলেদের জন্য:

জ্যাকেট নির্বাচনে ফিটিং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অতিরিক্ত ঢিলা বা বেশি টাইট জ্যাকেট স্টাইল নষ্ট করে দেয়, তাই শরীরের গঠনের সঙ্গে মানানসই কাট বেছে নেওয়া উচিত। শর্টার জ্যাকেট সাধারণত প্যান্ট বা জিন্সের সঙ্গে দারুণ মানায়, যা লুককে আরও স্ট্রাকচার্ড করে। ওভারকোট পরলে নিচে হালকা সোয়েটার এবং গলায় একটি স্কার্ফ যুক্ত করলে পুরো লুক পায় এক ধরণের পরিশীলিত, ক্লাসি টাচ।

মেয়েদের জন্য:

ফ্যাশনে ভারসাম্যই মূল কথা। ক্রপড জ্যাকেট জিন্স, স্কার্ট বা ড্রেসের সঙ্গে দারুণ যায়, এতে ফিগার ডেফিনিশনও ভালো আসে। অন্যদিকে এলিগ্যান্ট, ইউরোপিয়ান ধাঁচের লুক পেতে লং ওভারকোটের সাথে যোগ করতে হবে মিড-হিল বুট। এই শীতেও বিশ্বজুড়ে “লেয়ারিং” ট্রেন্ড চলছে। তাই পাতলা একটা সোয়েটারের ওপরে জ্যাকেট চাপিয়ে নিতেই পারেন নির্দ্বিধায়।

কালার কোঅর্ডিনেশন:

রঙের বাছাই করার জন্য ক্লাসিক ও ট্রেন্ডি প্র‌্যাকটিক্যাল নিউট্রাল, ২টি প্যালেটই রাখতে পারেন। কালো, নেভি, অলিভ ও বেইজ সব সময়ের নিরাপদ ও এলিগ্যান্ট রঙ। তবে ২০২৫ সালের শীতের ফ্যাশনে ব্রাউন, ডাস্টি পিঙ্ক এবং ফরেস্ট গ্রিন রঙ দাপট দেখাবে। এই শেডগুলো উষ্ণ আবহের সঙ্গে মানায় এবং জ্যাকেট বা কোটে এক ধরনের নরম, আধুনিক সৌন্দর্য এনে দেয়।

এই শীতের জ্যাকেট ট্রেন্ড। ছবি: লা রিভ

২০২৫ উইন্টারের ট্রেন্ড, কালার ডিজাইন

২০২৫ সালের শীতের ফ্যাশন ট্রেন্ডে জ্যাকেট ও ওভারকোটের ডিজাইনে ক্লাসিক সৌন্দর্যের সঙ্গে আধুনিক কার্যকারিতার মেলবন্ধন বেশ চোখে পড়ছে। এই বছর সাসটেইনেবল ফ্যাশন সবচেয়ে আলোচিত বিষয়। জ্যাকেট ও ওভারকোটের জন্য রিসাইকেলড পলিয়েস্টার, অর্গানিক কটন ও ইকো-ফ্রেন্ডলি উল ফ্যাব্রিক ব্যবহার করছে প্রায় সব বড় ব্র্যান্ড। কাটের ক্ষেত্রে ওভারসাইজড ও রিল্যাক্সড সিলুয়েট জনপ্রিয় হচ্ছে, যেখানে কমফোর্ট এবং ফ্লেক্সিবিলিটি দুটোই সমান গুরুত্ব পাচ্ছে। রঙে আসছে নতুন ধারা। বোল্ড নিউট্রাল টোন যেমন স্যান্ড, চারকোল, কফি ব্রাউন ও মিউটেড ব্লু টপ লিস্টে আছে, যা মিনিমাল অথচ পরিশীলিত লুক দেয়। একইসঙ্গে মিক্সড টেক্সচার ট্রেন্ডও বেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, বিশেষ করে উল ও লেদারের সংমিশ্রণ, কিংবা ডেনিমে ফক্স ফারের ব্যবহার। ফ্যাশন এখন আর জেন্ডারভিত্তিক নয়; তাই অনেক ব্র্যান্ড আনছে ইউনিসেক্স ও জেন্ডার-নিউট্রাল কালেকশন। সব মিলিয়ে, ২০২৫ সালের শীত হতে যাচ্ছে এমন এক সিজন যেখানে স্টাইল মানে আরাম, দায়িত্বশীলতা এবং আত্মপ্রকাশের এক দারুণ মিশেল।

উজ্জ্বল রঙ উঠে এসেছে ট্রেন্ডে। ছবি: লা রিভ

বাংলাদেশের বাজার বিশ্লেষণ

বাংলাদেশে শীতের পোশাকের বাজার মূলত ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত জমে ওঠে, আর এই সময়টাতেই ফ্যাশন ব্র্যান্ডগুলোর বিক্রি থাকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে। ঢাকায় এবং চট্টগ্রামে বাজার তুলনামূলকভাবে আধুনিক ও ট্রেন্ড-ড্রিভেন; এখানে আন্তর্জাতিক মানের ডিজাইন ও ফিউশন স্থানীয় ফ্যাশনকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছে। তরুণ ক্রেতারা এখানে মূলত বোম্বার, পাফার ও ডেনিম জ্যাকেটের দিকে ঝুঁকছেন, আর কর্পোরেট গ্রাহকদের মধ্যে জনপ্রিয়তা পাচ্ছে ক্লাসিক ওভারকোট ও ব্লেজার স্টাইল জ্যাকেট।

অন্যদিকে দেশের উত্তরাঞ্চল, বিশেষ করে রংপুর, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড় অঞ্চলে শীতের তীব্রতা বেশি থাকায় সেখানে প্র্যাকটিক্যাল চাহিদা তুলনামূলক উর্ধ্বে। এই এলাকাগুলোতে হেভি উল কোট, পার্কা ও পাফার জ্যাকেট বিক্রি হয় সবচেয়ে বেশি। রাজধানী-কেন্দ্রিক ব্র্যান্ডগুলোও এখন এই বাজারের দিকে নজর দিচ্ছে, কারণ স্থানীয় ক্রেতারা ধীরে ধীরে মান ও ডিজাইন সম্পর্কে আরও সচেতন হচ্ছেন।

অনলাইন মার্কেটেও পরিবর্তন স্পষ্ট। ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে পাফার, লেদার ও ওয়াটারপ্রুফ জ্যাকেটের বিক্রি লক্ষনীয়ভাবে বেড়েছে। অনেক অনলাইন স্টোর এখন আন্তর্জাতিক ডিজাইন ট্রেন্ড অনুসরণ করে সাশ্রয়ী দামে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত পোশাক বিক্রি করছে, যা নতুন প্রজন্মের ক্রেতাদের কাছে বেশ আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে।

মূল্যপরিসরও এখন বৈচিত্র্যময়। স্থানীয় জ্যাকেটের দাম সাধারণত ১২০০ থেকে ৩০০০ টাকা, ইম্পোর্টেড বা ব্র্যান্ডেড জ্যাকেটের দাম ৪০০০ থেকে ১৫,০০০ টাকা, আর উল বা ক্যাশমির ওভারকোটের দাম ৮০০০ থেকে ২৫,০০০ টাকা পর্যন্ত হয়েছে। কিছু প্রিমিয়াম ব্র্যান্ড এর জ্যাকেট ও ওভারকোটের দাম ৫০,০০০ টাকারও বেশি, যদিও সেগুলোর ক্রেতা গোষ্ঠী তুলনামূলক সীমিত।

জ্যাকেট ও ওভারকোট এখন আর কেবল শীতের প্রয়োজনীয় পোশাক নয়। এগুলো হয়ে উঠেছে ব্যক্তিত্ব, রুচি ও আত্মবিশ্বাসের পরিচায়ক। একজন মানুষের ফ্যাশন সেন্স যেমন তার চিন্তা ও রুচির প্রকাশ ঘটায়, তেমনি সঠিক পোশাক নির্বাচন তার উপস্থিতিকে প্রভাবশালী করে তোলে। ২০২৫ সালের শীত তাই কেবল ঠান্ডা থেকে রক্ষা পাওয়ার মৌসুম নয়; এটি হবে কমফোর্ট, ক্লিন ডিজাইন ও সাসটেইনেবিলিটি–র সমন্বয়ে তৈরি এক নতুন ফ্যাশন অধ্যায়, যেখানে জ্যাকেট ও ওভারকোট দিয়েই আপনি স্টাইল-স্টেটমেন্ট তৈরি করে ফেলতে পারবেন।

  • No products in the cart.
Filters