ধূসর পশ্চিমের রুক্ষ ক্যানভাসে বুনো জীবন আর সভ্যতার দ্বন্দ। এই নিয়ে ওয়েস্টার্ন সিনেমা তৈরি হয়ে আসছিলো ১৯০০ এর দশক থেকে। সবই গল্পই প্রায় একরকম, সব চরিত্র দেখতে একরকম, এমনকী অভিনেতাদের জীবন কাহিনীতেও খুব একটা হেরফের নেই। এরমধ্যেই আবির্ভাব The Man with No Name এর, স্প্যাগেটি ওয়েস্টার্ন জনরায় ক্লিন্ট ইস্টউড অভিনীত বিখ্যাত চরিত্র। পর্দায় হাজির হয়েই ইস্টউড অর্ধশতকের বাঁধাধরা ওয়েস্টার্ন হিরোর নতুন ইমেজ তৈরি করলেন শুধুমাত্র একটি কস্টিউম বা পরিধান দিয়ে। একটি সবুজ-বাদামী রঙের উলের পঞ্চো। ওই একটি পঞ্চোর মাধ্যমেই পরিচালক এমন একটি চরিত্র তৈরি করেছিলেন যার চারপাশ ঘিরে আছে রহস্য, অনুমান-অক্ষম আচরণ, প্রবল ব্যক্তিত্বের ইঙ্গিত।

পঞ্চোর এমনই প্রভাব ফ্যাশনে। দেখতে হয়তো শুধুই এক টুকরো কাপড়, কিন্তু এর ভেতর লুকিয়ে আছে হাজার বছরের ইতিহাস, সংস্কৃতি, ও ফ্যাশনের বিবর্তন। এটি যেমন বাস্তবিকভাবে ব্যবহারিক, তেমনই রুচিশীল পোশাক বলে পরিচিত বর্তমান বিশ্বজুড়ে।
Poncho শব্দটির মূল শব্দ ছিল পান্চু (punchu), যার অর্থ কাপড়ের আবরণ। চিলি ও আর্জেন্টিনার আরাউকানিয়ান ভাষায়ও অনুরূপ শব্দ pontro পাওয়া যায়, যার মানে উলের কাপড়।

ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে পঞ্চো পৃথিবীর নানা সংস্কৃতির পছন্দের পোশাক ছিল। এর শিকড় প্রাচীন সভ্যতাগুলোর গল্প বলে, যেখানে পঞ্চো কেবল পোশাক নয়, সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রতীক ছিল। এটি কেবল সুরক্ষার জন্য নয়, বরং সেই সকল আদিম গোত্রের আধ্যাত্মিকতা, সমাজ ও পরিচয়ের গল্প বহন করত। তাদের বোনা পঞ্চোগুলোতে নানা প্রতীক ও নকশা থাকত যা গোত্র, ধর্মীয় বিশ্বাস ও সামাজিক মর্যাদার ইঙ্গিত দিত। পরে ইউরোপীয় অভিযাত্রী ও উপনিবেশকারীরাও এই পোশাক গ্রহণ করেন, কারণ এটি ছিল টেকসই ও কার্যকর। সেখান থেকেই পঞ্চোর বৈশ্বিক রূপান্তর শুরু হয়।

সময় বদলেছে, কিন্তু পঞ্চো তার জনপ্রিয়তা হারায়নি। প্রথাগত বর্গাকার নকশা থেকে শুরু করে আজকের পঞ্চো শাল, পঞ্চো সোয়েটার, হুড, বোতাম, লেইস ও অলঙ্কারযুক্ত আধুনিক পঞ্চো, সবই এই বিবর্তনের ফল। এর একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হলো মেক্সিকান সেরাপে (Serape)। প্রথমে এটি ছিল মেসোআমেরিকার উপজাতিদের বাস্তবিক পোশাক, কিন্তু পরে এটি মেক্সিকোর জাতীয় গর্ব ও ফ্যাশনের প্রতীকে পরিণত হয়। উজ্জ্বল রঙ ও জটিল নকশার সেরাপে আজ মেক্সিকান সংস্কৃতির সমার্থক।
আন্দিজের ইনকা সভ্যতার বয়নশিল্পীরা কাপড়কে সোনার চেয়েও মূল্যবান ভাবতেন। তাদের পঞ্চোর নকশায় দেখা যেত জ্যামিতিক প্যাটার্ন, যা সমাজ, আধ্যাত্মিকতা ও ভারসাম্যের প্রতীক। মধ্য আমেরিকার মায়া নারীরা আজও শতাব্দী পুরনো ব্যাকস্ট্র্যাপ লুমে কাপড় বুনে চলেছেন। তাদের পিক বিল কৌশলে মোটা সুতো দিয়ে নকশা দেখতে অনেকটা এমব্রয়ডারির মতো। ভারতের কারিগররা কাশ্মিরি ঐতিহ্য থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে হাতে এমব্রয়ডারি করা ফুলেল পঞ্চো তৈরি করেন মূলত আড়ি কাজ (চেইন স্টিচ) ব্যবহার করে। কাজ এবং নকশা দিয়েই পঞ্চো নিজস্ব স্টাইল-স্টেটমেন্ট তৈরি করতে দারুন কাজে আসছে।
পঞ্চোর মূল নকশা মূলত একটি বর্গাকার বা আয়তাকার কাপড়। এর মাঝখানে মাথা ঢোকানোর জন্য একটি ছিদ্র করে নিলেই তৈরি হয়ে যায় পঞ্চো। অনেক সময় পঞ্চো গোলাকার হয়, বা সামনের দিক খোলা থাকে। তবে সব ক্লাসিক পঞ্চোই হাতাবিহীন এবং সাধারণ পোশাকের উপর পরা হয়।
দুই ধরনের পঞ্চো সবচেয়ে প্রচলিত । উষ্ণতা ও ফ্যাশনের জন্য তৈরি কাপড়ের পঞ্চো ও জলরোধী (waterproof) পঞ্চো। কাপড়ের পঞ্চো সাধারণত উলের বা আলপাকার তৈরি, যা আপনাকে উষ্ণ রাখবে। আর বৃষ্টির পঞ্চো হালকা ও জলরোধী, অনেক সময় হুডসহ হয়। মার্কিন সামরিক বাহিনী প্রথম জলরোধী পঞ্চো ব্যবহার করে ১৮৫০-এর দশকে, যা পরবর্তীতে ১৯৪০-এর দশকে জনপ্রিয় সামরিক সরঞ্জাম হয়ে ওঠে। এই পঞ্চো শুধু ঠান্ডা, বাতাস, কুয়াশা বা বৃষ্টি থেকে সুরক্ষা দিতো না। প্রয়োজনে তাঁবু বা হ্যামক হিসেবেও ব্যবহার করা যেত। আজকাল ভ্রমণপ্রেমীরা এই ছাঁটে যে রেইনকোট ব্যবহার করেন, তাও একধরনের পঞ্চো’ই। তবে জলরোধী পঞ্চোর ব্যবহার হয় প্রয়োজন ভেদে। অন্যদিকে কাপড়ে বোনা পঞ্চোর ব্যবহার পৌঁছে গেছে হাই-এন্ড ব্র্যান্ডগুলোর র্যাম্পওয়াক এবং স্ট্রিট ফ্যাশনেও।
পঞ্চোর নানান ধরণ
পঞ্চোর স্টাইল ও উপকরণ যত বৈচিত্র্যময়, তার ব্যবহারও ততটাই। উল-ব্লেন্ড করা সুতোয় বোনা পঞ্চো, কাশ্মিরী উলের পঞ্চো, আলপাকা উলের হালকা কিন্তু উষ্ণ সংস্করণ, সবই জনপ্রিয়। কিছু পঞ্চো একদম পাতলা জালের মতো, আবার কিছু ঘন ও ভারী কাপড়ের। এই বছর জর্জেট, শিফট এবং ক্রুশ করা পঞ্চোও ট্রেন্ডে দেখা যাচ্ছে। উষ্ণতার বদলে শুধু ফ্যাশন অনুষঙ্গ হিসেবেও পঞ্চোর ব্যবহার প্রতিদিন বাড়ছে। পঞ্চো পাওয়া যাচ্ছে নানা ধরনের কাট ও ডিজাইনে। যেমন
- কাওল নেক, ভি-নেক বা টার্টল নেক
- একরঙা, চেক, বা তার ওপরেই ফুলেল নকশা
- রিভার্সিবল বা হুডযুক্ত
- হাতে বানানো ক্রোশেট ফ্রিঞ্জ বা এমব্রয়ডারি করা বর্ডারসহ
একটি পঞ্চোকে ভিন্নভাবে পরলেই পুরো লুক বদলে যায়। সামনের দিক লম্বা রেখে রুয়ানার স্টাইলে পরলে শালের কাজ করবে। আবার পাশ দিয়ে ঝুলিয়ে রাখল কিমানোর স্টাইল দেবে। ফ্রিঞ্জের পঞ্চোগুলি বোহেমিয়ান ফ্যাশনে খুবই জনপ্রিয়। অভিজাত পার্টি বা ফ্যাশনের জন্য পঞ্চোতে যোগ হচ্ছে আর্টিফিশিয়াল বা ফক্স ফার।
আধুনিক ফ্যাশনে পঞ্চো
ষাটের দশকে হিপ্পি সংস্কৃতি এবং নৈমিত্তিক পোশাকের প্রতি আগ্রহের কারণে পঞ্চো জনপ্রিয়তা লাভ করে। এটি তখন আমেরিকান ফ্যাশনের একটি অনুষঙ্গে পরিণত হয়। তখন পঞ্চোকে হিপ্পি পোশাক হিসেবেই দেখা হত।


YSL এর সেই বিখ্যাত পঞ্চোর র্যাম্প ও ফটোশ্যুট (ছবি: ইন্সটাগ্রাম)
অভিজাত আয়োজনে পঞ্চোকে জনপ্রিয় করে তোলার পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান ইভস সাঁ–লরঁ (Yves Saint Laurent) বা YSL এর। ১৯৬৭ সালের ’বামবারা’ কালেকশনে ফ্রেঞ্চ এই ব্র্যান্ডটি আফ্রিকান কালচারের অংশ হিসেবে তাদের র্যাম্পে পঞ্চো নিয়ে আসে। বারবেরি (Burberry)-র ক্লাসিক টার্টান পঞ্চো থেকে র্যালফ্ লরেন (Ralph Lauren) এর বিলাসবহুল কাশ্মীর সংস্করণ পর্যন্ত, প্রতিটি ব্র্যান্ডই পঞ্চোকে নিজের মতো করে পুনর্নির্মাণ করেছে।
২০০৪-২০০৫ সালের ফল/উইন্টার কালেকশনে পঞ্চো আবারও ফ্যাশনে ফিরে আসে। বর্তমানে পঞ্চো আরামদায়ক এবং বহুমুখী ব্যবহারের জন্য ফল/উইন্টার ফ্যাশনে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করেছে। ২০২৩ সালে শীতকালে এর ব্যবহার ব্যাপক বৃদ্ধি পায় এবং ২০২৪ এবং ২০২৫ সালে এটি আবারও আধুনিক রূপে ফ্যাশন ট্রেন্ডে ফিরে এসেছে, যেখানে ডিজাইনাররা এটিকে নতুন নতুন উপাদান এবং শৈলীতে উপস্থাপন করছেন।
গর্ভবতী মায়েদের জন্যও পঞ্চো চমৎকার আবরণ হয়ে উঠেছে। শীতকালের বিয়েতে পশ্চিমা বিয়েতে সাদা বা ক্রিম পঞ্চো নববধূর আভিজাত্যপূর্ণ আবরণ হিসেবে দেখা যাচ্ছে। আবার সমুদ্রসৈকতে ছোট পঞ্চো হতে পারে নিখুঁত কাভার-আপ। পুরুষদের জন্যও তৈরি হচ্ছে দুর্দান্ত সব পঞ্চোর স্টাইল।


বারবেরি ও র্যালফ লরেন ব্র্যান্ডের মেনজ পঞ্চো (ছবি: ইন্সটাগ্রাম)
পুরুষদের জন্য পঞ্চো
হালকা, আরামদায়ক, সহজে পরিধানযোগ্য বিধায় পুরুষদের পঞ্চো এখন দারুণ জনপ্রিয়। পঞ্চো এমন এক পোশাক যা জিনস, খাকি বা ফরমাল প্যান্ট, সব কিছুর সাথেই যায়। অফিসে বা আড্ডায় একরঙা বা স্ট্রাইপ পঞ্চো ভালো মানায়। আধুনিক ওম্ব্রে টোন বা জ্যামিতিক ডিজাইনও এখন পুরুষদের ফ্যাশনে দাপট দেখাচ্ছে।
পঞ্চো পরার স্টাইল গাইড
পঞ্চো সঠিকভাবে পরতে জানলে পুরো লুকের সংজ্ঞাই বদলে যায়। পঞ্চো পরার কৌশল রপ্ত করতে পারলে যেকোনো সাধারণ পোশাক মুহূর্তেই হয়ে উঠতে পারে অনন্য ফ্যাশন স্টেটমেন্ট। এটি একইসঙ্গে আরামদায়ক, বহুমুখী ও আভিজাত্যপূর্ণ, যা দিনের কাজ থেকে শুরু করে সন্ধ্যার আড্ডা, এমনকি বিশেষ অনুষ্ঠান পর্যন্ত মানিয়ে যায়। আপনি যদি হালকা ক্রোশেট পঞ্চো পরেন গ্রীষ্মের সন্ধ্যায়, কিংবা ভারী উলের পঞ্চো শীতের ঠান্ডায়, প্রতিবারই এটি আপনাকে দেবে নতুন লুক ও আলাদা উপস্থিতি। পঞ্চোর সঠিক রঙ, কাপড় ও কাট বেছে নিতে পারলেই এটি হয়ে উঠবে ব্যক্তিত্ব প্রকাশের শক্তিশালী মাধ্যম।
নারীদের জন্য:
- টাইট-ফিট জিনস বা লেগিংসের সঙ্গে পঞ্চো দারুণ মানায়। ট্রাডিশনাল পোশাকের সাথে পরতে চাইলে সিগারেট পাজামা বা কুলোট প্যান্ট বেছে নিতে পারেন।
- কোমরে বেল্ট ব্যবহার করলে পঞ্চো দিয়েই স্টাইলিশ শেপ তৈরি করা যায়। ফিগারও সুন্দরভাবে ফুটে ওঠে।
- পঞ্চোর সাথে ভারী বুট বা পা কভার করা হিল বেছে নিতে পারেন। সাথে স্টেটমেন্ট জুয়েলারির ব্যবহার পঞ্চোর লুক আরও গ্ল্যামারাস করে তোলে।
পুরুষের জন্য:
- টি-শার্ট বা হালকা সোয়েটারের ওপর পঞ্চো পরা যায়। লেয়ারিং এর জন্য শালের চাইতে পঞ্চো সুবিধাজনক ও স্টাইলিশ।
- জিনস বা টেইলার্ড ট্রাউজারের সঙ্গে বেশি মানায়।
- লোফার বা সুয়েড বুটের সঙ্গে পরলে পঞ্চোর লুক আধুনিক ও পরিশীলিত হয়ে ওঠে।
- পঞ্চোর নিচে বেসিক লেয়ারের জন্য একটু গাড় রঙের পোশাক বেছে নিলে ভালো। আর বটম ফিটেড হলেই ভালো।
পঞ্চো শুধুই এক টুকরো কাপড় নয় । এটি ইতিহাস, পরিচয়, কারিগরি দক্ষতা ও সংস্কৃতির সংমিশ্রণ। প্রাচীন আন্দিজ থেকে শুরু করে আধুনিক র্যাম্প পর্যন্ত, পঞ্চো আজও সময়ের সীমানা পার হওয়া পোশাক হিসেবে ফ্যাশনে তার জায়গা ধরে রেখেছে। প্রথাগত হাতে বোনা নকশা হোক, বা সাহসী হাই-ফ্যাশন স্টেটমেন্ট, পঞ্চো ফ্যাশনের ইতিহাসে চিরকাল এক অনন্য অধ্যায় হিসেবেই থাকবে।
লেখক: খাদিজা ফাল্গুনী







