শীত শেষে শীতের কাপড় পরিষ্কার ও সংরক্ষণ: ফেব্রিক অনুযায়ী সহজ গাইড

শীতের কাপড় যেভাবে পরিষ্কার ও সংরক্ষণ করবেন

শীতের কাপড় যেভাবে পরিষ্কার ও সংরক্ষণ করবেন

বাংলাদেশে শীত খুব দীর্ঘ নয়। জানুয়ারির শেষ দিকেই দিনের তাপমাত্রা একটু একটু করে বাড়তে শুরু করে, আর ফেব্রুয়ারিতে শীতের কাপড় ধীরে ধীরে আলমারির ভেতরে উঠে যায়। কিন্তু এই তাড়াহুড়োর সময়ই অনেকের সবচেয়ে বড় ভুল হয়, কাপড় না ধুয়ে, ঠিকভাবে শুকানো ছাড়াই গুছিয়ে ফেলা। কয়েক মাস পর শীত ফিরে এলে দেখা যায় কাপড়ে স্যাঁতসেঁতে গন্ধ, ছত্রাকের দাগ কিংবা পোকার কামড়। সামান্য পরিকল্পনা আর কিছু নিয়ম মেনে চললেই এসব ঝামেলা এড়ানো যায়।

শীতের কাপড় সংরক্ষণের আগে প্রথম কাজ হলো সব কাপড় পরিষ্কার করা। কেউ কেউ ভাবেন, ’এক–দুবার পরা, দাগ নেই, ধোয়ার দরকার কী?’ আসলে দাগ না থাকলেও শরীরের ঘাম, ত্বকের তেল আর বাতাসের ধুলো কাপড়ে লেগে থাকে। দীর্ঘদিন রেখে দিলে এগুলো থেকেই দুর্গন্ধ হয়, কাপড় বিবর্ণ দেখায়, আর স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে ছত্রাকও ধরতে পারে। তাই শীত শেষ হওয়ার আগেই সোয়েটার, জ্যাকেট, কোট, ব্লেজার, শাল, সব কিছুর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা জরুরি।

উলের সোয়েটার বা কার্ডিগান পরিষ্কারের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা দরকার। উল খুব সংবেদনশীল ফেব্রিক; সাধারণ ডিটারজেন্টে জোরে ঘষলে আঁশ নষ্ট হয়, ববলিন ওঠে, কাপড় শক্ত হয়ে যায় এবং আকারও বদলে যেতে পারে। এসব ফেব্রিক কুসুম গরম বা ঠান্ডা পানিতে উল-উপযোগী ডিটারজেন্ট বা হালকা শ্যাম্পু ব্যবহার করে আলতোভাবে ধুতে হবে। ধোয়ার পর কাপড় চিপে পানি ঝরাতে গিয়ে মোচড় দেওয়া যাবে না। অতিরিক্ত পানি ঝরানোর জন্য পরিষ্কার তোয়ালের ভেতরে কাপড় রেখে আলতো করে চাপ দিন। এরপর সমান করে বিছিয়ে ছায়ায় শুকাতে দিন। উলের কাপড় ঝুলিয়ে শুকালে নিজের ওজনেই লম্বা হয়ে যায়। অথচ এই ভুলটাই আমরা সবচেয়ে বেশি করি।

কটন বা কটন-মিশ্রিত হুডি, সোয়েটশার্ট কিংবা থার্মাল পরিস্কার করা তুলনামূলক সহজ। তবে এখানে সমস্যাটা হয় রঙ ও প্রিন্ট নিয়ে। বেশি গরম পানিতে ধুলে বা তীব্র ডিটারজেন্ট ব্যবহার করলে রঙ ফিকে হতে পারে, প্রিন্ট নষ্টও হতে পারে। ঠান্ডা পানিতে, রঙিন কাপড়ের জন্য নিরাপদ ডিটারজেন্ট ব্যবহার করলে ভালো থাকে। শুকানোর সময় সরাসরি ঝলমলে রোদ এড়িয়ে ছায়ায় শুকালে কাপড়ের রঙ দীর্ঘদিন টিকে।

কোট, ব্লেজার বা ফরমাল জ্যাকেটের মতো পোশাকের ভেতরে লাইনার, প্যাডিং বা একাধিক স্তর থাকে। এসব পোশাক ঘরে ধোয়া বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। দাগ না থাকলে প্রথমে ব্রাশ বা শুকনা কাপড় দিয়ে ধুলো ঝেড়ে নিন, তারপর বাতাসে কিছুক্ষণ রেখে দিন। যদি কলার বা হাতার অংশে ময়লা জমে, স্পট ক্লিনিং করা যেতে পারে। আর পুরো কাপড়ই যদি ধোয়ার প্রয়োজন হয়, ড্রাই ক্লিন করানো নিরাপদ। ড্রাই ক্লিনের পর কাপড় সরাসরি আলমারিতে তুলে না রেখে কিছুক্ষণ বাতাসে রেখে দিন, যেন ভেতরে কোনো গন্ধ বা আর্দ্রতা আটকে না থাকে।

পাফার জ্যাকেট বা ডাউন জ্যাকেটের ক্ষেত্রে সমস্যা হয় ভেতরের ফিলিং নিয়ে। এ ধরনের জ্যাকেট ঘরে ধুলে ফিলিং দলা পাকিয়ে যেতে পারে। যদি বাড়িতে ধুতেই হয়, খুব হালকা সেটিং এবং কম স্পিনে ধোয়া ভালো। শুকানোর সময় পুরোপুরি শুকানো জরুরি, না হলে ভেতরে গন্ধ ধরে। তবে নিরাপদ পদ্ধতি হলো কেয়ার লেবেল দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া, আর সন্দেহ হলে ড্রাই ক্লিন বা প্রফেশনাল ক্লিনিং।

লেদার জ্যাকেট বা লেদারের জুতা–বুটের যত্ন একেবারেই আলাদা। লেদারকে ভিজিয়ে ধোয়া উচিত নয়। শুকনা, নরম কাপড় দিয়ে মুছে ধুলো তুলে ফেলুন। দাগ হলে লেদার-সেফ ক্লিনার ব্যবহার করতে পারেন। এরপর লেদার কন্ডিশনার লাগালে চামড়া শুকিয়ে ফেটে যাওয়ার ঝুঁকি কমে। লেদারের জিনিস কখনো প্লাস্টিকে মুড়ে বন্ধ করে রাখা ঠিক নয় কারণ বাতাস চলাচল না করলে ফাঙ্গাস ধরতে পারে।

উল, কটন ও সিল্কের শাল, মাফলার ও স্কার্ফ পরিষ্কারের সময় ফেব্রিক অনুযায়ী ধোয়ার পদ্ধতি ঠিক করতে হবে। সিল্ক বা সূক্ষ্ম ফেব্রিক হলে ঠান্ডা পানিতে খুব হালকা ডিটারজেন্টে আলতো করে ধোয়া ভালো। রঙিন শালের ক্ষেত্রে প্রথমে সামান্য ভিজিয়ে দেখে নিন রঙ ছাড়ে কি না। রঙ ছাড়লে একসঙ্গে অন্য কাপড়ের সঙ্গে ধোয়া যাবে না। এসব কাপড় রোদে না দিয়ে ছায়ায় শুকালে রঙ ও নরমভাব বজায় থাকে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো কাপড় পুরোপুরি শুকানো। অনেক সময় বাইরে থেকে শুকনা মনে হলেও ভেতরের স্তরে আর্দ্রতা থেকে যায়। বিশেষ করে কোট, পাফার বা মোটা সোয়েটারে। এই আর্দ্রতাই পরে স্যাঁতসেঁতে গন্ধ এবং ছত্রাকের মূল কারণ। তাই ভাঁজ করার আগে নিশ্চিত হন কাপড় একেবারে শুকিয়েছে কি না। প্রয়োজনে একদিন বেশি সময় দিন, কিন্তু তাড়াহুড়ো করে তুলে রাখবেন না।

এবার সংরক্ষণের নিয়ম। উলের সোয়েটার বা নিট কাপড় সবসময় ভাঁজ করে রাখতে হবে। হ্যাঙ্গারে ঝুলিয়ে রাখলে কাঁধের অংশ ঢিলে হয়ে যায়, আকারও নষ্ট হয়। কোট বা ব্লেজার ঝুলিয়ে রাখা যায়, তবে শক্ত ও ভালো মানের হ্যাঙ্গার ব্যবহার করা জরুরি, যাতে শেপ ঠিক থাকে। খুব বেশি ভিড় করে কাপড় গুঁজে রাখলে ভাঁজের দাগ পড়ে এবং বাতাস চলাচল কমে যায়, ফলে দুর্গন্ধের আশঙ্কা বাড়ে।

কাপড় রাখার জন্য কী ব্যবহার করবেন, সেটাও গুরুত্বপূর্ণ। অনেকেই এয়ারটাইট প্লাস্টিক ব্যাগে ভরে রাখেন। এতে ধুলো থেকে বাঁচে ঠিকই, কিন্তু ভেতরে সামান্য আর্দ্রতা থাকলে তা বের হতে পারে না। ফলে কয়েক মাসে গন্ধ বা ফাঙ্গাস তৈরি হতে পারে। সম্ভব হলে কটন বা নন-ওভেন ফ্যাব্রিকের স্টোরেজ ব্যাগ ব্যবহার করুন। যদি প্লাস্টিক বক্স বা ব্যাগই ব্যবহার করেন, ভেতরে সিলিকা জেল বা শুকনো শোষক রাখুন, যাতে আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণে থাকে।

পোকামাকড় থেকে বাঁচাতে ন্যাপথালিন ব্যবহার খুব প্রচলিত। কিন্তু অতিরিক্ত ন্যাপথালিন কাপড়ে গন্ধ বসিয়ে দেয়, এবং দীর্ঘদিন রেখে দিলে ফেব্রিকেও ক্ষতি করতে পারে। বিকল্প হিসেবে শুকনো নিমপাতা, লবঙ্গ বা হারবাল রিপেলেন্ট ব্যবহার করতে পারেন। আর যেটাই ব্যবহার করুন, কাপড়ের সঙ্গে সরাসরি ঘষা লাগে। এভাবে না রেখে, আলাদা ছোট পাউচে বা কাগজে মুড়ে রাখাই ভালো।

শেষে আলমারি বা সংরক্ষণের জায়গাটাও প্রস্তুত করুন। কাপড় তোলার আগে আলমারির ভেতরটা শুকনা কাপড় দিয়ে মুছে নিন। প্রয়োজনে এক–দুদিন দরজা খুলে রাখুন, যাতে ভেতরের স্যাঁতসেঁতে ভাব চলে যায়। বর্ষাকালে আর্দ্রতা বাড়ে, তাই শীতের কাপড় যেখানে রাখবেন সেখানে বাতাস চলাচল হয় কি না, সেটা খেয়াল রাখুন। কাপড়ের ওপর ভারী কিছু চাপিয়ে রাখলে ভাঁজ পড়ে যেতে পারে, এটাও এড়িয়ে চলুন।

শীতের কাপড় সংরক্ষণ মানে শুধু আলমারিতে তুলে রাখা নয়, এটা পরের শীতের জন্য নিশ্চিন্ত প্রস্তুতি। এখন একটু যত্ন নিলে আগামী শীত এলে কাপড় বের করেই পরা যাবে গন্ধ, দাগ বা পোকার দুশ্চিন্তা ছাড়াই।

  • খাদিজা ফাল্গুনী
    ছবি: এআই জেনারেটেড
  • No products in the cart.
Filters