ব্লেজার এমন এক পোশাক যা একই সঙ্গে ’ক্লাসিক’ আর ’কনটেম্পোরারি’, দুই পরিচয়ই বহন করে। একসময় ব্লেজার ছিল কেবল পুরুষদের স্পোর্টস ক্লাব আর নৌবাহিনীর ফরমাল জ্যাকেটের কাছাকাছি ডিজাইন। আজ তা অফিস, ক্যাজুয়াল আউটিং, রেড কার্পেট এমনকি স্ট্রিটওয়্যারেও সমান শক্তিশালী পোশাক। নারীদের ওয়ারড্রোবেও ব্লেজার ঢুকেছে ক্ষমতা আর স্বাধীনতার প্রতীক হয়ে। ফ্যাশনে কীভাবে জনপ্রিয় হলো ব্লেজার? ইতিহাস থেকে শুরু করে ২০২৫ সালের বাজার, বাজেট ও ট্রেন্ড, সবকিছু পড়ে নিন এই ব্লগে।
বোটিং জ্যাকেট থেকে বোর্ডরুম
’ব্লেজার’ শব্দটা প্রথম জনপ্রিয় হয় উনিশ শতকে, ইংল্যান্ডে। ফ্যাশনের ইতিহাস বলে, কেমব্রিজের লেডি মার্গারেট বোট ক্লাবের নৌ-দৌড় দলের সদস্যরা উজ্জ্বল লাল ফ্ল্যানেলের জ্যাকেট পরতেন। ওই জ্যাকেট এত উজ্জ্বল ছিল যে দর্শকরা বলত জ্যাকেটগুলো যেন ’আগুনের মতো জ্বলছে’ (Blazing like fire)! সেখান থেকেই ’Blazer’ নামটা আসে। পরে ক্রিকেট, টেনিস, বোটিংসহ বিভিন্ন স্পোর্টে এই রঙিন ক্লাব-কোট চালু হয়। সময়ের সাথে এই জ্যাকেট ‘অড জ্যাকেট’ হিসেবে স্যুট থেকে আলাদা হয়ে যায়। কারণ এই জ্যাকেট একই কাপড়ের প্যান্ট না হলেও যেকোন আউটফিটে মানিয়ে যায়। এটিই পুরুষদের আধুনিক ব্লেজার ডিজাইনের মূল ভিত হয়ে দাঁড়ায়। বিশ শতকে কর্পোরেট দুনিয়ায় স্যুটিং-কালচার বাড়ার সাথে ব্লেজার হয়ে দাঁড়ায় নারী ও পুরুষদের স্মার্ট ফর্মাল পোশাকের প্রধান অংশ।
পাওয়ার ড্রেসিংয়ের ভাষা
নারীদের ফ্যাশনে ব্লেজার এর প্রবেশ ছিল এক ধরনের সামাজিক বিপ্লব। ১৯২০–এর দশকে কোকো শ্যানেল নারীদের জন্য নরম টেইলারিং ও টুইড ব্লেজার এনে দেন, যা ’ফেমিনিন কিন্তু স্ট্রং’ লুক তৈরি করে। শ্যানেলের টুইড জ্যাকেট আজও ব্লেজারের ক্লাসিক আইকন হয়ে আছে। এরপর ১৯৬৬ সালে ইভ সাঁ লোরাঁ (Yves Saint Laurent) নারীদের জন্য ’Le Smoking’ স্যুট লঞ্চ করেন। এটি একটি টাক্সিডো-স্টাইল ব্লেজার যা নারীর ক্ষমতা, স্বাধীনতা ও আকর্ষনীয় মিনিমালিজম সেন্সকে একসাথে তুলে ধরে। আশির দশকে ’পাওয়ার ড্রেসিং’ ট্রেন্ডে শোল্ডার-প্যাড ব্লেজার নারীদের কর্পোরেট আইডেন্টিটির প্রতীক হয়ে ওঠে। সাম্প্রতিক রেড কার্পেট ও রানওয়েতে ড্রেপিং, ওভারসাইজ কাট, বোল্ড কালার, সবই ব্লেজারকে আবার নতুনভাবে স্টেটমেন্টে পরিণত করেছে।
ব্লেজারের বিখ্যাত ব্র্যান্ডগুলো
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্লেজারের বড় ব্র্যান্ডগুলোর মধ্যে আছে শ্যানেলের টুইড ও ক্লাসিক ব্লেজার, ইভ সাঁ লোরাঁর শার্প টেইলারিং ও লে-স্মোকিং লাইন দেয়া ব্লেজার, বারবেরির টেইলারড, ব্রিটিশ কাট ব্লেজার। পুরুষদের পাওয়ার ব্লেজারের জন্য আবার আরমানি বেশি জনপ্রিয়। হুগো বস, র্যালফ লরেন, জারা, এইচঅ্যান্ডএম, ইউনিকলোর ডাবল-ব্রেস্টেড ও ওভারসাইজ ভ্যারিয়েশন এই বছরের রানওয়েতেও দারুণ সাড়া ফেলেছে। বাংলাদেশের জনপ্রিয় ব্র্যান্ড লা রিভ প্রতিবছর শীতের মৌসুমে নারী ও পুরুষের ব্লেজার নিয়ে আলাদা সেগমেন্টই লঞ্চ করছে।
সবচেয়ে বিখ্যাত ব্লেজার…?
ব্লেজারের শতেক রকমের মাঝেও কিছু ব্লেজার কালজয়ী হয়ে উঠেছে, তা কী জানেন? পুরুষদের ক্ষেত্রে আইকনিক ব্লেজার কালার এর তালিকায় নেভি ব্লু সিঙ্গেল-ব্রেস্টেড ব্লেজার শীর্ষে, যা ব্রিটিশ নেভাল-স্টাইল থেকে এসেছে এবং আজও “স্মার্ট ক্যাজুয়াল” এর বেজ ইউনিফর্ম। এছাড়া সার্ভিস/মিলিটারি কাট ব্লেজার, টুইড স্পোর্ট কোট এবং আরমানির সফট-শোল্ডার ইতালিয়ান ব্লেজার আধুনিক পুরুষ ফ্যাশনে ক্লাসিক। নারীদের আইকনিক ব্লেজারের মধ্যে শ্যানেলের টুইড জ্যাকেট এবং ইভ সাঁ লোরাঁর স্মোকিং টাক্সিডো ব্লেজার সবচেয়ে প্রভাবশালী। এ দুটোই নারীদের টেইলারিংয়ে ’স্টাইল ও ক্ষমতা’র প্রতীক বলে বিবেচিত। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই স্টাইলগুলো এখনো বিভিন্নভাবে মোডিফাই করা হচ্ছে।
বাংলাদেশে ব্লেজারের বিবর্তন
বাংলাদেশে ব্লেজারের জনপ্রিয়তা প্রথম বড় আকারে বাড়ে ১৯৯০–এর দশকে, কর্পোরেট অফিস, ব্যাংকিং, বিশ্ববিদ্যালয় ও মিডিয়া পেশার বিস্তারের ফলে। প্রথম দিকে বাজারে মূলত টেইলার-মেড ব্লেজারই ছিল স্ট্যান্ডার্ড। ঢাকার নিউ মার্কেট, গাউসিয়া, আজিজ সুপার মার্কেট কিংবা চট্টগ্রামের রিয়াজউদ্দিন বাজারের টেইলাররা এই সেগমেন্ট এখনো ধরে রেখেছেন। এখন রেডিমেড ব্র্যান্ডগুলোর বিস্তারে ব্লেজার আরও অ্যাক্সেসিবল এবং ট্রেন্ডি হয়েছে। দেশি ব্র্যান্ডগুলো ফ্যাব্রিক, ফিট ও কানস্ট্রাকশনে ডিজাইন করেছে। বিশেষ করে প্রিমিয়াম নিট ফেব্রিক এর ব্লেজারগুলো। অ্যান্টি-রিঙ্কেল এবং ব্রিদেবল হওয়ায় সারাবছর যেকোন আয়োজনে এই ব্লেজারগুলিই সবার পছন্দের শীর্ষে উঠে এসেছে। এছাড়াও বিজনেস ক্যাজুয়াল ব্লেজার ও বিজনেস ফর্মাল ব্লেজার এর ট্রেন্ডি ডিটেইলগুলো দিন দিন সব বয়সীদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
কোন সময়ে কেমন ব্লেজার পরবেন?
উপলক্ষ্য অনুযায়ী স্টাইলিশ ব্লেজার কোট ডিজাইন সিলেকশনে বিড়ম্বনায় পড়তে হয় প্রায়ই। এক্ষেত্রে মনে রাখা ভালো যে, বাংলাদেশের আবহাওয়ায় ফ্যাব্রিক চয়েজই বড় ফ্যাক্টর। শীতের জন্য উল, উল-ব্লেন্ড বা টুইড ব্লেজার সবচেয়ে উপযুক্ত; এগুলো স্ট্রাকচার ধরে রাখে ও শরীরও উষ্ণ রাখে। গরম বা হিউমিড সিজনে লিনেন, কটন, বা লাইটওয়েট পলি-ভিসকোস ব্লেজার আরামদায়ক এবং সোয়েট-রেজিস্ট্যান্ট হয়। অফিস বা ফর্মাল ইভেন্টে নেভি, চারকোল, ব্ল্যাক বা গ্রে টেইলারড ব্লেজার নিরাপদ পছন্দ; ক্যাজুয়াল আউটিংয়ে চেক, টেক্সচারড, বা ওভারসাইজ ব্লেজার ভালো কাজ করে। নারীদের ক্ষেত্রে ড্রেস, স্কার্ট বা ওয়াইড-লেগ প্যান্টের সাথে ক্রপড বা বেল্টেড ব্লেজার সন্ধ্যার ইভেন্টে বেশি মানায়। আজকাল নারীদের জ্যাকেটও ব্লেজারের স্ট্রাকচারে ডিজাইন করা হচ্ছে। যা নিমেষে আউটলুকে ব্লেজারের স্মার্টনেস নিয়ে আসে।
ব্লেজার পরার এটিকেট
ব্লেজার পরার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম হলো ফিট ও প্রোপোরশন। কাঁধের সেলাই কাঁধের শেষ লাইনে বসতে হবে, আর হাতা কব্জির হাড় পর্যন্ত লম্বা হবে, তাহলেই লুক শার্প থাকে। ফর্মাল সেটিংয়ে বোতামের স্ট্যান্ডার্ড মানা উচিত। যেমন, সিঙ্গেল-ব্রেস্টেড ব্লেজার পরে দাঁড়িয়ে থাকলে শুধুমাত্র উপরের বোতাম বন্ধ রাখা, বসলে খুলে দেওয়া। ডাবল-ব্রেস্টেড ব্লেজারে সাধারণত বোতাম বন্ধ রাখাই নিয়ম। ক্যাজুয়াল লুকে স্লিভ একটু রোল-আপ, টি-শার্ট বা টার্টলনেকের ওপর ব্লেজার, পায়ে স্নিকার্স। এগুলো এখন কনটেম্পোরারি এটিকেটের অংশ। নারীদের জন্যও একই নিয়ম। তবে, অতিরিক্ত ঢিলা ব্লেজার হলে ভেতরের লেয়ার স্লিম রাখলে ব্যালান্স আসবে।
২০২৫ সালের ব্লেজার ট্রেন্ড
২০২৫–এ ব্লেজার ট্রেন্ডের কোর থিম হলো আরাম, স্টেটমেন্ট ও সাসটেইনেবিলিটি। ওভারসাইজ ও রিল্যাক্সড কাট সবচেয়ে বড় ট্রেন্ড, শোল্ডার হালকা স্ট্রাকচার্ড, কিন্তু বডি ফ্লুইড বা ফ্লেক্সিবল। ড্রেপিং বা রাউন্ডেড হেম, ডাবল-ব্রেস্টেড রিটার্ন, আর টেক্সচারড ফ্যাব্রিক যেমন টুইড, কর্ডুরয়, ভেলভেট এবার স্পেশাল স্পটলাইটে আছে। রঙে বোল্ড নিউট্রাল যেমন ব্রাউন, চারকোল, স্যান্ড, অলিভের সাথে বারগান্ডি ও ডিপ গ্রিন দেখা যাচ্ছে। এই বছর টেকসই ফ্যাব্রিক ও রিসাইকেলড ম্যাটেরিয়ালের ব্যবহারও বাড়ছে।
বাংলাদেশে ব্লেজারের বাজার ও বাজেট
বাংলাদেশে ব্লেজারের বাজার এখন তিন স্তরে ভাগ করা যায়। প্রথম স্তরে কাস্টম টেইলারিং, যেখানে ফ্যাব্রিক ও মেজারমেন্টভেদে সাধারণত ৩,৫০০–৮,০০০ টাকার মধ্যে ভালো ব্লেজার পাওয়া যায়। দ্বিতীয় স্তরে দেশি রিটেইল বা রেডিমেড ব্র্যান্ড, এগুলোতে সাধারণত ৪,০০০–১২,০০০ টাকার মধ্যে সিজনাল ও অফিস-রেডি ব্লেজার পাওয়া যায়। লা রিভের মত ব্র্যান্ডগুলি আজকাল নারীদের ব্লেজারেও দারুন সব সাশ্রয়ী কালেকশন দিচ্ছে। তৃতীয় স্তরে ইম্পোর্টেড বা প্রিমিয়াম বা হাই-এন্ড ডিজাইনার ব্র্যান্ড, যেখানে দাম ১২,০০০ থেকে ৪০,০০০+ পর্যন্ত যেতে পারে। অনলাইনে ব্র্যান্ড-সাইটগুলোতে ডিসকাউন্ট সিজনে ভালো ডিলও পাওয়া যায়, তবে ফিটিং রিস্ক মাথায় রাখা দরকার।
শেষ কথা
ব্লেজার এমন এক ’স্টাইল ইনভেস্টমেন্ট’ যা যুগ বদলালেও বদলায় না, শুধু নিজেকে নতুনভাবে উপস্থাপন করতে শেখে। পুরুষদের ক্ষেত্রে এটি শার্প প্রেজেন্স দেয়, আর নারীদের ক্ষেত্রে শক্তি ও এলিগেন্সকে একসাথে তুলে ধরে। সঠিক ফিট, সঠিক ফ্যাব্রিক আর সঠিক অকেশন বুঝে ব্লেজার বেছে নিলে, আপনার ওয়ারড্রোব এক ধাপে নয়, এক লাফে আপগ্রেড হবে, গ্যারান্টিড!















